কুরবানির ইতিহাস, ফাযায়েল ও মাসায়েল
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
কুরবানির ইতিহাস, ফাযায়েল ও মাসায়েল
মুফতি মুহাম্মদ আল-আমিন
কোরবানি শব্দের অর্থ হচ্ছে, নিকটবর্তী হওয়া, সান্নিধ্য লাভ করা, প্রবাহিত করা, জবাই করা। কুরআনুল কারিমে এটি দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল কুরআনে সূরা আল মায়েদার ২৭ নম্বর আয়াতে উল্লেখ আছে,اِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانًا অর্থাৎ "যখন তার দু‘জনে কোরবানি পেশ করলো বা পশু জবাই করলো, বা জবাই করে ফেলে আসল"। সূরা আল কাওসারে বলা হয়েছে, فصل لربك وانحر. অর্থাৎ "হে নবী! আপনার ‘রব’ এর স্মরণে সালাত আদায় করুন ও তাঁর সন্তুষ্টির জন্যে কোরবানি করুন"। পরিভাষায়- আল্লাহ তা'য়লার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সাহিবে নিসাব ঈদুল আযহার দিন সমুহে নির্দিষ্ট প্রাণী জবাই করাকে কুরবানি বলে।
কোরবানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস : দুনিয়ায় মানব বসতির শুরুতেই কোরবানির প্রচলন শুরু হয়েছে। পৃথিবীর প্রথম মানুষ আমাদের আদি পিতা ও নবী হজরত আদম (আ.) এর সন্তান কাবিল ও হাবিল এর বিবাহকে কেন্দ্র করে কুরবানির যাত্রা শুরু হয়। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা হচ্ছে-
واتۡلُ عَلَیۡہِمۡ نَبَاَ ابۡنَیۡ اٰدَمَ بِالۡحَقِّ ۘ اِذۡ قَرَّبَا قُرۡبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنۡ اَحَدِہِمَا وَ لَمۡ یُتَقَبَّلۡ مِنَ الۡاٰخَرِ ؕ قَالَ لَاَقۡتُلَنَّکَ ؕ قَالَ اِنَّمَا یَتَقَبَّلُ اللّٰہُ مِنَ الۡمُتَّقِیۡنَ.
"(হে নবী!) আপনি এদের কাছে আদমের দুই সন্তানের গল্পটি যথাযথভাবে শুনিয়ে দিন; গল্পটি ছিলো, যখন তারা দু‘জনে আল্লাহর নামে কোরবানি পেশ করলো, তখন তাদের মধ্যে একজনের (হাবিলের) কাছ থেকে কোরবানি কবুল করা হলো, আর একজনের (কাবিলের) কোরবানি কিছুতেই কবুল করা হলো না, (যার কোরবানি কবুল করা হয়নি) সে বললো আমি অবশ্যই তোমাকে (যার কোরবানি কবুল করা হলো তাকে) হত্যা করবো, সে (যার কোরবানি কবুল করা হলো) বললো, আল্লাহ তায়ালা তো শুধু পরহেজগার লোকদের কাছ থেকেই কোরবানি কবুল করে থাকেন"(সূরা আল মায়েদা-৫-২৭)।
আজকে মুসলিম সমাজে কোরবানির যে প্রচলন তা মূলত মুসলিম মিল্লাতের বা জাতির পিতা হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর দেখানো পথ বা সুন্নাত। হজরত ইব্রাহীম (আ.) এর শতবর্ষ বয়সের পর আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যে সন্তান দান করেছিলেন, তিনি আল্লাহ তায়ালা কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে তাঁর সে কলিজার টুকরা হজরত ইসমাইল (আ.) এর কোরবানির সূত্র ধরে আজও কোরবানি প্রচলিত আছে। হজরত ইসমাইল (আ.) এর যখন হাঁটা-চলা ও খেলাধুলা করার বয়স তখন হজরত ইব্রাহীম (আ.) কে স্বপ্নে আদেশ করা হলো, তুমি তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর নামে কোরবানি করো। ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ১০টি উট কোরবানি করলেন। পুনরায় তিনি আবারো একই স্বপ্ন দেখলেন। অতঃপর ইব্রাহীম (আ.) আবারো ১০০টি উট কোরবানি করলেন। আবারো তিনি একই স্বপ্ন দেখে ভাবলেন, আমার কাছেতো এ মুহূর্তে আমার কলিজার টুকরা প্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.) ছাড়া আর তেমন কোনো প্রিয় বস্তু নেই। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
"رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ.فَبَشَّرْنَاهُ بِغُلَامٍ حَلِيمٍ. فَلَمَّاۤ بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَىٰ فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَىٰ ۚ قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ ۖ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ. فَلَمَّاۤ اَسۡلَمَا وَ تَلَّہٗ لِلۡجَبِیۡنِ. وَ نَادَیۡنٰہُ اَنۡ یّٰۤاِبۡرٰہِیۡمُ.قَدۡ صَدَّقۡتَ الرُّءۡیَا ۚ اِنَّا کَذٰلِکَ نَجۡزِی الۡمُحۡسِنِیۡنَ. اِنَّ ہٰذَا لَہُوَ الۡبَلٰٓـؤُا الۡمُبِیۡنُ.وَ فَدَیۡنٰہُ بِذِبۡحٍ عَظِیۡمٍ. وَ تَرَکۡنَا عَلَیۡہِ فِی الۡاٰخِرِیۡنَ.سَلٰمٌ عَلٰۤی اِبۡرٰہِیۡمَ.
"অতঃপর আমি তাকে (হজরত ইব্রাহীম আ. কে) একজন ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দান করলাম। সে যখন পিতার সাথে হাঁটা-চলার উপযোগী হলো, তিনি (ইব্রাহীম আ.) বললেন, হে আমার পুত্র! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে কোরবানি করছি। সুতরাং তোমার মতামত কি? সে (হজরত ইসমাইল আ.) বললেন, হে আমার পিতা! আপনি যে বিষয়ে আদিষ্ট হয়েছেন তা পালন করুন। আপনি আমাকে আল্লাহর মেহেরবানিতে ধৈর্যশীলদের একজন পাবেন। অতঃপর যখন তাঁরা দু‘জন একমত হলো আর আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছার সামনে আত্মসমর্পণ করল এবং ইব্রাহীম (আ.) ইসমাইল (আ.) কে জবাই করার জন্যে কাত করে শুইয়ে দিলো; তখন আমি ইব্রাহীমকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইব্রাহীম, তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যে রূপ দিয়েছো। নিশ্চয়ই এটা ছিল ইব্রাহীম ও ইসমাইলের জন্যে একটা পরীক্ষা। অতঃপর আমি ইব্রাহীমকে দান করলাম একটি মহা কোরবানির পশু। অনাগত মানুষের জন্যে এ (কোরবানির) বিধান চালু রেখে, তাঁর স্মরণ আমি অব্যাহত রেখে দিলাম। শান্তি বর্ষিত হোক ইব্রাহীমের ওপর। আমি এভাবেই সৎপরায়ণ ব্যক্তিদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।" (সূরা আস সফফাত-১০১-১০৯)
কুরবানীর গুরুত্ব ও ফযীলত: কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সামর্থ্যবান নর-নারীর উপর কুরবানি ওয়াজিব। এটি মৌলিক ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আদম আ. থেকে সকল যুগে কুরবানি ছিল। তবে তা আদায়ের পন্থা ছিল ভিন্ন । শরীআতে মুহাম্মাদীর কুরবানি মিল্লাতে ইবরাহীমীর সুন্নত। সেখান থেকেই এসেছে এই কুরবানি। এটি শিয়ারে ইসলাম তথা ইসলামের নিদর্শন। এর মাধ্যমে গরীব-দুঃখী ও পাড়া-প্রতিবেশীর আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শর্তহীন আনুগত্যের শিক্ষা রয়েছে কুরবানিতে। পাশাপাশি আল্লাহ তা'আলার জন্য ত্যাগ ও বিসর্জনের সুযোগ রয়েছে আছে এতে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
فصل لربك وانحر.
অর্থ :" অতএব আপনি আপনার রবের উদ্দেশ্যে নামায পড়ুন এবং কুরবানি আদায় করুন।" (সুরা কাওসার : ৩)
অন্য আয়াতে এসেছে-
قل ان صلاتى ونسكى ومحياى ومماتى لله رب العالمين.
অর্থ :" (হে রাসূল!) আপনি বলুন, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ (অর্থাৎ আমার সবকিছু) আল্লাহ রাববুল আলামীনের জন্য উৎসর্গিত। "(সূরা আনআম : ১৬২)
পশু জবাই করে কুরবানী করার মধ্যে এই হিকমত আছে যে, আল্লাহর মুহব্বতে নিজের সকল অবৈধ চাহিদা ও পশুত্বকে কুরবানী করা এবং ত্যাগ করা। সুতরাং কুরবানী থেকে কুপ্রবৃত্তির দমনের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। এছাড়া এর মধ্যে রয়ােছে তাকওয়ার অনুশীলন।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন-
لن ينال الله لحومها ولا دمائها ولكن يناله التقوى منكم.
অর্থ :(মনে রেখো, কুরবানির জন্তুর) গোশত অথবা রক্ত আল্লাহর কাছে কখনোই পৌঁছে না; বরং তাঁর কাছে কেবলমাত্র তোমাদের পরহেযগারিই পৌঁছে। (সূরা হজ্ব : ৩৭)++
কুরবানী সম্পর্কে হাদিস শরীফে এসেছে-
عن عائشة رضي الله تعالى عنها أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : ما عمل آدمي من عمل يوم النحر أحب إلى الله من إهراق الدم، إنه ليأتي يوم القيامة بقرونها وأشعارها وأظلافها، وإن الدم ليقع من الله بمكان قبل أن يقع من الأرض، فطيبوا بها نفسا.
"উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কুরবানির দিনের আমলসমূহের মধ্য থেকে পশু কুরবানি করার চেয়ে কোনো আমল আল্লাহ তাআলার নিকট অধিক প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন এই কুরবানীকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কুরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহ তাআলার নিকট কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কুরবানি কর।" (জামে তিরমিযী, হাদীস : ১৪৯৩)
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানি করবে না তার ব্যাপারে হাদিস শরীফে এসেছে-
عن أبي هريرة قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : من وجد سعة لأن يضحي فلم يضح فلا يقربن مصلانا.
"হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যার কুরবানির সামর্থ্য আছে তবুও সে কুরবানি করল না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’' (মুসনাদে আহমদ ২/৩২১)
কুরবানির কিছু জরুরি মাসায়েল: ইবাদতের মূলকথা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন এবং শরীয়তের নির্দেশনা সম্পাদন করা। এখানে কুরবানীর কিছু জরুরি মাসায়েল উপস্থাপন করা হল।
★ মাসয়ালা : (১) প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজন-অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানি করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বর্তমানে বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি। টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্ত্তর ক্ষেত্রে নিসাব হল সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্ত্ত মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। যেমন কারো নিকট কিছু স্বর্ণ ও কিছু টাকা আছে, যা সর্বমোট সাড়ে বায়ান্ন তোলা চাঁদির মূল্য সমান হয় তাহলে তার উপরও কুরবানি ওয়াজিব।
★মাসয়ালা : (২) একান্নভুক্ত বা যৌত পরিবারের মধ্যে একাধিক ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পাওয়া গেলে অর্থাৎ তাদের কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে তাদের প্রত্যেকের উপর ভিন্ন ভিন্ন কুরবানি ওয়াজিব। পরিবারের যত সদস্যের উপর কুরবানী ওয়াজিব তাদের প্রত্যেককেই একটি করে পশু কুরবানি করতে হবে কিংবা বড় পশুতে পৃথক পৃথক অংশ দিতে হবে। একটি কুরবানি সকলের জন্য যথেষ্ট হবে না।
★মাসয়ালা : (৩) কুরবানির নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানির তিন দিন থাকলে এমনকি ১২ তারিখ সূর্যাস্তের কিছু আগে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে গেলেও কুরবানি ওয়াজিব হবে। (রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২)
★মাসয়ালা : (৪) নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে নফল কুরবানি করতে পারবে।(রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬)
★মাসয়ালা : (৫) যে ব্যক্তি কুরবানির দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়।( আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫)
★মাসয়ালা : (৬) নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই এমন দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানি করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানির নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়।
★মাসয়ালা : (৭) যিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত মোট তিন দিন কুরবানির সময়। তবে সবচেয়ে উত্তম হল প্রথম দিন কুরবানি করা। এরপর দ্বিতীয় দিন এরপর তৃতীয় দিন।( ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫)
عن البراء عن النبي صلى الله عليه وسلم قال : إن أول ما نبدأ به في يومنا هذا أن نصلي ثم نرجع فننحر، فمن فعل ذلك فقد أصاب سنتنا، ومن ذبح قبل فإنما هو لحم قدمه لأهله، ليس من النسك في شيء.
"হযরত বারা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ঈদের দিন আমরা প্রথমে নামায আদায় করি। অতপর ফিরে এসে কুরবানি করি। যে ব্যক্তি এভাবে আদায় করবে সে আমাদের নিয়ম মতো করল। আর যে নামাযের আগেই পশু জবাই করল সেটা তার পরিবারের জন্য গোশত হবে, এটা কুরবানি হবে না।"(সহীহ মুসলিম ২/১৫৪)
★মাসয়ালা : (৮) কুরবানির সময়- যেসব এলাকার লোকদের উপর জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানি করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয় তাহলে ঈদের নামায আদায় পরিমাণ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কুরবানি করা জায়েয। (সহীহ বুখারী ২/৮৩২)
روى الشيخان عن الرسول صلى الله عليه وسلم قال : من ذبح قبل الصلاة فإنما يذبح لنفسه ومن ذبح بعد الصلاة فقد تم نسكه وأصاب سنة المسلمين.
"রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈদের নামাযের পূর্বে কুরবানীর পশু জবাই করবে সেটা তার নিজের জন্য সাধারণ জবাই হবে। আর যে নামায ও খুতবার পর জবাই করবে তার কুরবানী পূর্ণ হবে এবং সে-ই মুসলমানদের রীতি অনুসরণ করেছে।"(সহীহ বুখারী ২/৮৩৪) ১০ ও ১১ যিলহজ্ব দিবাগত রাতেও কুরবানি করা জায়েয। তবে দিনে কুরবানি করাই ভালো। (আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০)
★মাসয়ালা : (৯) কেউ যদি কুরবানির দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানি দিতে না পারে তাহলে কুরবানির পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানির উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করেছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানি দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে ( ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫) কুরবানির দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।( আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১)
★মাসয়ালা : (১০) উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা নর-মাদা দ্বারা কুরবানি করা জায়েয। তবে উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কুরবানি করা জায়েয। ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানি জায়েয হবে না। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে। যদি বিক্রেতা কুরবানির পশুর বয়স পূর্ণ হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের অবস্থা দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর নির্ভর করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানি করা যাবে।(আহকামে ঈদুল আযহা) এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। তদ্রূপ হাঁস-মুরগি বা কোনো পাখি দ্বারাও কুরবানি জায়েয নয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
ولكل امة جعلنا منسكا ليذكروا اسم الله على ما رزقهم من بهيمة الأنعام.
অর্থ: "আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানির নির্দেশ দিয়েছি। আল্লাহ তাদের রুযি হিসেবে যেসব গৃহপালিত পশু দিয়েছেন তার উপর তারা যেন (জবাই করার সময়) আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারে।"(সূরা হজ্ব : ৩৪) জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত,
أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : لا تذبحوا إلا مسنة، إلا أن يعسر عليكم فتذبحوا جذعة من الضأن.
"তোমরা (কুরবানির জন্য) মুসিন্নাহ ব্যতীত যবাই করো না। (মুসিন্নাহ হল, ৫ বছর বয়সী উট, ২ বছরের গরু ও ছাগলের ক্ষেত্রে ১ বছর [শরহুন নববী]) যদি সম্ভব না হয় তবে ছয় মাস বয়সী ভেড়া বা দুম্বা।"(সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৯৬৩)যদি বিক্রেতা কুরবানির পশুর বয়স পূর্ণ হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের অবস্থা দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর নির্ভর করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানি করা যাবে।(আহকামে ঈদুল আযহা)
★মাসয়ালা : (১১) একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানি দিতে পারবে। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারো কুরবানি সহীহ হবে না। হাদিস শরীফে এসেছে -
وعن جابر قال : أمرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم أن نشترك في الإبل والبقر كل سبعة منا في بدنة.
"জাবির রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ করেছেন যে, আমরা একটি গরু এবং একটি উটে সাতজন করে শরীক হয়ে যাই।"(সহীহ মুসলিম-১২১৮) তবে সাতজনে মিলে কুরবানি করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হবে না। যেমন কারো আধা ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানি সহীহ হবে না। উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানি করা জায়েয। এক্ষেত্রে সতর্কতার বিষয় হলো যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানি না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানি সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানি হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮)
★মাসয়ালা : (১২) কুরবানির পশুতে আকিকা- কুরবানির গরু, মহিষ ও উটে কুরবানির অংশ বাদে অবশিষ্ট অংশে আকিকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানি ও আকিকা দুটোই সহীহ হবে। ছেলের জন্য দুই অংশ আর মেয়ের জন্য এক অংশ দিতে হবে। শৈশবে আকিকা করা না হলে বড় হওয়ার পরও আকিকা করা যাবে। যার আকিকা সে নিজে এবং তার মা-বাবাও আকিকার গোশত খেতে পারবে। ফাতাওয়া শামীসহ ফিকহ-ফাতাওয়ার কিতাবাদিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, কুরবানির সাথে আকিকা সহীহ। (রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬)
★মাসয়ালা : (১৩) কুরবানি করতে হবে সম্পূর্ণ হালাল সম্পদ থেকে। হারাম টাকা দ্বারা কুরবানি করা সহীহ নয় এবং এক্ষেত্রে অন্য শরীকদের কুরবানিও সহীহ হবে না।
★মাসয়ালা : (১৪) যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কুরবানি দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে তার জন্য এ পশুতে অন্যকে শরীক করা জায়েয। তবে এতে কাউকে শরীক না করে একা কুরবানি করাই শ্রেয়। শরীক করলে সে টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরীব হয়, যার উপর কুরবানি করা ওয়াজিব নয়, তাহলে যেহেতু কুরবানির নিয়তে পশুটি ক্রয় করার মাধ্যমে লোকটি তার পুরোটাই আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছে তাই তার জন্য এ পশুতে অন্যকে শরীক করা জায়েয নয়। যদি শরিক করে তবে ঐ টাকা সদকা করে দেওয়া জরুরি হবে। কুরবানির পশুতে কাউকে শরীক করতে চাইলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে নিতে হবে।(কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১)
★মাসয়ালা : (১৫) কুরবানির পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম। এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা কুরবানি করা জায়েয নয়। যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না এমন পশু দ্বারা কুরবানি করা জায়েয নয়। যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে পশুর কুরবানি জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে গেছে বা শিং একেবারে উঠেইনি সে পশু কুরবানি করা জায়েয। যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। আর যদি অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কুরবানি জায়েয। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে অসুবিধা নেই। যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। হযরত আলী রা. বলেন, আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন, আমরা যেন কুরবানির পশুর চোখ ও কান ভালো করে দেখে নিই এবং কান কাটা, কান ছেঁড়া বা কানে গোলাকার ছিদ্র করা পশু দ্বারা কুরবানি না করি। (মুসনাদে আহমদ ১/৮০; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২৮০৪) যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন পশুর কুরবানী জায়েয নয়। হযরত বারা ইবনে আযেব (রা.)থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা:)বলেন-
أربع لا يضحى بهن العوراء البين عورها والمريضة البين مرضها والعرجاء البين ضلعها والعجفاء التي لا تنتقي.
অর্থাৎ "চার ধরনের পশু দ্বারা কুরবানি করা যাবে না। যে পশুর চোখের জ্যোতি ক্ষতিগ্রস্ত, যে পশু অতি রোগাক্রান্ত, যে পশু বেশি খোঁড়া আর যে পশু অতি শীর্ণকায়।" ( জামে তিরমিযী, হাদীস - ১৪৯৭)
★মাসয়ালা : (১৬) কুরবানির পশু হারিয়ে যাওয়ার পরে কুরবানিদাতা ধনী হলে দুটির একটি কুরবানি করলেই চলবে। তবে দুটি কুরবানি করাই উত্তম। গরীব ব্যক্তির ক্রয়কৃত পশু হারিয়ে গেলে তার জন্য আরেকটি পশু কুরবানি করা আবশ্যকীয় নয়, তারপরও যদি সে আরেকটি পশু কুরবানির জন্য কিনে ফেলে তবে সেটি জবাই করা জরুরি হয়ে যায় এবং হারানোটি পাওয়া গেলে তাও জবাই করতে হবে।(সুনানে বায়হাকী ৫/২৪৪)
★মাসয়ালা : (১৭) গর্ভবতী পশু কুরবানি করা জায়েয। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কুরবানী করা মাকরূহ। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায় তাহলে সেটাও জবাই করতে হবে এবং কেউ চাইলে এর গোশতও খেতে পারবে।(কাযীখান ৩/৩৫০) বন্ধ্যা পশুর কুরবানি জায়েয। (রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫)
★মাসয়ালা : (১৮) কুরবানির নিয়তে ভালো পশু কেনার পর যদি তাতে এমন কোনো দোষ দেখা দেয় যে কারণে কুরবানী জায়েয হয় না তাহলে ওই পশুর কুরবানি সহীহ হবে না। এর স্থলে আরেকটি পশু কুরবানি করতে হবে। তবে ক্রেতা গরীব হলে ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই কুরবানি করতে পারবে। ( রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫)
★মাসয়ালা : (১৯) কুরবানির পশু নিজে জবাই করা উত্তম। তবে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এক্ষেত্রে কুরবানিদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো। (আলমগীরী ৫/৩০০) অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে তবে ওই কুরবানি সহীহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। (রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪)
★মাসয়ালা : (২০) কুরবানির পশু কেনার পর বা নির্দিষ্ট করার পর তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েয নয়। যেমন হালচাষ করা, আরোহণ করা, পশম কাটা ইত্যাদি। সুতরাং কুরবানির পশু দ্বারা এসব করা যাবে না। যদি করে তবে পশমের মূল্য, হালচাষের মূল্য ইত্যাদি সদকা করে দিবে। কুরবানির পশুর দুধ পান করা যাবে না। যদি জবাইয়ের সময় আসন্ন হয় আর দুধ দোহন না করলে পশুর কষ্ট হবে না বলে মনে হয় তাহলে দোহন করবে না। প্রয়োজনে ওলানে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দেবে। এতে দুধের চাপ কমে যাবে। যদি দুধ দোহন করে ফেলে তাহলে তা সদকা করে দিতে হবে। নিজে পান করে থাকলে মূল্য সদকা করে দিবে। ( আলমগীরী ৫/৩০০-৩০১)
★মাসয়ালা : (২১) কয়েকজন মিলে কুরবানি করার ক্ষেত্রে জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিসরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানি করার অনুমতি দেয় তবে তা জায়েয হবে। নতুবা ওই শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে। সেক্ষেত্রে তার স্থলে অন্যকে শরীক করা যাবে। (আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬)
★মাসয়ালা : (২২) কুরবানির পশু ক্রয়ের পর জবাইয়ের আগে বাচ্চা দিলে ওই বাচ্চার গোশত খাওয়া যাবে না। পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। তবে ওই বাচ্চা জবাই না করে জীবিত সদকা করে দেওয়া উত্তম।(আলমগীরী ৫/৩০১)
★মাসয়ালা : (২৩) মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানি করা জায়েয। মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে তবে সেটি নফল কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানির স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কুরবানির ওসিয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না। গরীব-মিসকীনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। (মুসনাদে আহমদ ১/১০৭)
কুরবানির গোশত জমিয়ে রাখা
★মাসয়ালা : (২৪) কুরবানির গোশত ফ্রিজে রাখা বা প্রক্রিয়াজাত করে রাখা জায়েয।( মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৮)
★মাসয়ালা : (২৫) শরীকে কুরবানি করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়।(আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭)
★মাসয়ালা : (২৬) কুরবানির গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকীনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত নিজে রেখে দেওয়াও নাজায়েয নয়।( আলমগীরী ৫/৩০০)
★মাসয়ালা : (২৭) কুরবানির গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে প্রাপ্ত মূল্য সদকা করে দিতে হবে। ( আলমগীরী ৫/৩০১)
★মাসয়ালা : (২৮) জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্য নির্ধারিত পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া যাবে।(আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৮)
★মাসয়ালা : (২৯) ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করা উত্তম। নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ। (বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২-২২৩)
★মাসয়ালা : (৩০) এক পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই করবে না। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে প্রয়োজনের অধিক কষ্ট দিবে না।
★মাসয়ালা : (৩১) কুরবানির গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয।( হিন্দিয়া ৫/৩০০)
★মাসয়ালা : (৩২) অন্যের ওয়াজিব কুরবানি দিতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কুরবানী আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করে তাহলে দেশীয় প্রচলনের কারণে তাদের কুরবানি আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো।(বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১১)
★মাসয়ালা : (৩৩) কুরবানির পশু যদি চুরি হয়ে যায় বা মরে যায় আর কুরবানিদাতার উপর পূর্ব থেকে কুরবানি ওয়াজিব থাকে তাহলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। গরীব হলে (যার উপর কুরবানি ওয়াজিব নয়) তার জন্য আরেকটি পশু কুরবানি করা ওয়াজিব নয়।(বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬)
★মাসয়ালা : (৩৪) কুরবানিদাতার জন্য নিজ কুরবানির গোশত খাওয়া মুস্তাহাব। (সূরা হজ্ব ২৮)
★মাসয়ালা : (৩৪) কুরবানি ওয়াজিব এমন ব্যক্তিও ঋণের টাকা দিয়ে কুরবানি করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সুদের উপর ঋণ নিয়ে কুরবানি করা যাবে না।
★মাসয়ালা : (৩৫) সামর্থ্যবান ব্যক্তির রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কুরবানি করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রা.কে তার পক্ষ থেকে কুরবানি করার ওসিয়্যত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকেও কুরবানি দিতেন। (সুনানে আবু দাউদ ২/২৯)
★মাসয়ালা : (৩৬) যেমনিভাবে মৃতের পক্ষ থেকে ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরবানি করা জায়েয তদ্রূপ জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ইসালে সওয়াবের জন্য নফল কুরবানি করা জায়েয। এ কুরবানির গোশত দাতা ও তার পরিবারও খেতে পারবে।-রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬
★মাসয়ালা : (৩৭) কুরবানীর চামড়া কুরবানিদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করা জরুরি। সদকার নিয়ত না করে নিজের খরচের নিয়ত করা নাজায়েয ও গুনাহ।(আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৮)
★মাসয়ালা : (৩৮) কুরবানির সময়ের প্রথম দিকে মুসাফির থাকার পরে ৩য় দিন কুরবানির সময় শেষ হওয়ার পূর্বে মুকীম হয়ে গেলে তার উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে প্রথম দিকে মুকীম ছিল অতপর তৃতীয় দিনে মুসাফির হয়ে গেছে এক্ষেত্রে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব থাকবে না। অর্থাৎ সে কুরবানি না দিলে গুনাহগার হবে না।( আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৯)
★মাসয়ালা : (৩৯) ঈদুল আযহার দিন সম্ভব হলে সর্বপ্রথম নিজ কুরবানির গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল থেকে কিছু না খেয়ে প্রথমে কুরবানীর গোশত খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্বের জন্য। ১১ বা ১২ তারিখের গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়। (জামে তিরমিযী ১/১২০)
★মাসয়ালা : (৪০) কুরবানির মৌসুমে অনেক মহাজন কুরবানির হাড় ক্রয় করে থাকে। টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে হাড় সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। কিন্তু কোনো কুরবানিদাতার জন্য নিজ কুরবানির কোনো কিছু এমনকি হাড়ও বিক্রি করা জায়েয হবে না। করলে মূল্য সদকা করে দিতে হবে।(ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১)
★মাসয়ালা : (৪১) কুরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। গোশতও পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ সময় ঘরের অন্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও গোশত খাওয়ানো যাবে।( ইমদাদুল মুফতীন)
★মাসয়ালা : (৪২) জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন দু’টি দুম্বা যবেহ করেছেন। যবেহর সময় সেগুলোকে কিবলামুখী করে বলেছেন-
اِنِّیْ وَجَّهْتُ وَجْهِیَ لِلَّذِیْ فَطَرَ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضَ حَنِیْفًا وَّ مَاۤ اَنَا مِنَ الْمُشْرِكِیْنَ اِنَّ صَلَاتِیْ وَ نُسُكِیْ وَ مَحْیَایَ وَ مَمَاتِیْ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِیْنَ لَا شَرِیْكَ لَهٗ ۚ وَ بِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَ اَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِیْنَ ، بِسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبرُ، اَللّهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ عَنْ مُحَمَّدٍ وَّأُمَّتِهِ.(সুনানে আবু দাউদ ৩/৯৫)
★মাসয়ালা : (৪৩) উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "যে কুরবানির ইচ্ছা রাখে সে যেন যিলহজ্বের চাঁদ দৃষ্টিগোচর হওয়ার পর থেকে কুরবানি করা পর্যন্ত তার নখ, চুল ইত্যাদি কর্তন না করে।"(সহীহ মুসলিম হাদীস ১৯৭৭/৩৯-৪২)
কোরবানির শিক্ষা : কোরবানি কোনো চাপ বা জবরদস্তি বিষয় নয়। মানুষ স্বেচ্চায় তার প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় সবচাইতে প্রিয় বস্তু ত্যাগ করার মানসিকতা সৃষ্টি করে। যেমন হজরত ইব্রাহীম (আ.) শুধু মাত্র স্বপ্নে দেখেছেন, তোমার প্রিয় বস্তু আল্লাহর রাহে কোরবানি করো। আর অমনি তিনি তাঁর আদরের একমাত্র সন্তান হজরত ইসমাইল (আ.)কে কোরবানির জন্যে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত ছিলেন। পৃথিবীতে মানুষের কাছে সবচাইতে আকর্ষণীয় বস্তুর মধ্যে অর্থ-সম্পদ বা টাকা-কড়ি আর সন্তান অন্যতম। এই অর্থ-সম্পদের মোহ ত্যাগের এ মানসিকতা সৃষ্টি করাই হচ্ছে কোরবানির শিক্ষা। কোরবানি আমাদের ঈমান ও তাকওয়া বৃদ্ধি করে ও পরকালের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করে। রাসূল (সা.) নির্দেশ করেছেন, হে লোকসকল তোমরা ত্রুটিমুক্ত ও উত্তম প্রাণি কোরবানি করো, কারণ কোরবানির এ পশুগুলো হবে তোমাদের জান্নাতে যাওয়ার বাহন’(বায়হাকি)
লেখক পরিচিতি : প্রভাষক ( আরবি), হযরত শাহজালাল ফাযিল মাদরাসা, ওসমানীনগর, সিলেট।
alaminangarjur@gmail.com
01746468377
- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন