হিংসা

হিংসা

মুহাম্মদ আল-আমিন 

হিংসা-বিদ্বেষ একটি ভয়ানক সংক্রামক ব্যাধি। মানুষের হীন মনমানসিকতা, ঈর্ষাপরায়ণতা, সম্পদের মোহ, পদমর্যাদার লোভ-লালসা থেকে হিংসা-বিদ্বেষের উৎপত্তি ও বিকাশ হয়। হিংসা-বিদ্বেষ মুমিনের সৎ কর্ম ও পুণ্যকে তার অজান্তে কুরে কুরে খেয়ে ফেলে। মানুষ হিংসা-বিদ্বেষ, লোভ-লালসা, শঠতা-কপটতা, অশান্তি, হানাহানি প্রভৃতি সামাজিক অনাচারের পথ পরিহার করে পারস্পরিক ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হবে এবং ইসলামের পরিশীলিত জীবনবোধে উদ্বুদ্ধ হবে—এটিই ধর্মের মূলকথা।

★★★হিংসা কি? 

হিংসা হচ্ছে- অন্যের ভালো কিছু দেখে ঈর্ষায় কাতর হয়ে সেটা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কামনা করা। হিংসাকে আরবিতে ‘হাসাদ’ বলে। 

★★★হিংসার প্রকারভেদ-

হিংসা দু প্রকার। যথা-

(ক) প্রকৃত হিংসা, তা হচ্ছে; অন্যের নেয়ামতগুলো দূর হওয়ার আশা প্রকাশ করা। এটাকে হাসাদে মাযমুমা বলে। যা হারাম-অবৈধ। 

(খ) রূপক হিংসা, তা হচ্ছে; অপরের নেয়ামত দূর হওয়ার আশা না করে অনুরূপ প্রাপ্তির আশা করা; এটাকে আরবিতে 'গিবতা' বলা হয়। ইবাদাতের ক্ষেত্রে হলে এটা প্রশংসনীয়, গুনাহের ক্ষেত্রে নিন্দনীয়-অবৈধ।

★★★হিংসার পারম্ভিককাল-

★সর্বপ্রথম হিংসার যাত্রা শুরু করেছিল ইবলিস। আল্লাহ তা'য়লা সকল ফেরেস্তাদেরকে হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সিজদা করতে বলেন তখন অস্বীকৃতি জানিয়ে ইবলিসের যে ঔদ্ধত্য ও অহংকার করেছিল তার মূলে ছিল হিংসা।  কুরআনের ভাষায়-

قَالَ اَرَءَیْتَكَ هٰذَا الَّذِیْ كَرَّمْتَ عَلَیَّ.

"সে বলল, দেখুন তো, এই কি সেই সৃষ্টি, যাকে আপনি আমার ওপর মর্যাদা দান করেছেন?" [সূরা ইসরা-১৭ : ৬২]

★মানব ইতিহাসের শুরুর দিককার কথা। পৃথিবীতে মানব পরিবার বলতে তখনো কেবলই হযরত আদম আলাইহিস সালামের পরিবার। হযরত হাওয়া রা.-এর সঙ্গে তাঁর সংসার। তাঁদের সন্তান জন্ম নিত জোড়ায় জোড়ায় এক ছেলে এক মেয়ে। তাদের জন্যে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে বিশেষ নিয়ম ছিল এমন জমজ ভাইবোন পরস্পর বিয়ে করতে পারবে না। যাদের জন্ম আগে-পরে, তারা একে অন্যকে বিয়ে করতে পারবে। হযরত আদম আলাইহিস সালামের দুই ছেলের নাম ছিল হাবীল ও কাবীল। কাবীলের সঙ্গে যে বোনের জন্ম হয় সে ছিল অধিক সুশ্রী। তাই নিয়ম ভেঙ্গে কাবীল তাকেই বিয়ে করতে চায়। আর নিয়ম টিকিয়ে তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী ছিল হাবীলও। দ্বন্দ্ব নিরসনে তাদেরকে কুরবানী করতে বলা হল। যার কুরবানী কবুল হবে সে-ই তার উক্ত বোনকে বিয়ে করতে পারবে। এর পরের কাহিনী পবিত্র কুরআনের ভাষায়-

اِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ اَحَدِهِمَا وَ لَمْ یُتَقَبَّلْ مِنَ الْاٰخَرِ قَالَ لَاَقْتُلَنَّكَ قَالَ اِنَّمَا یَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِیْنَ  لَىِٕنْۢ بَسَطْتَّ اِلَیَّ یَدَكَ لِتَقْتُلَنِیْ مَاۤ اَنَا بِبَاسِطٍ یَّدِیَ اِلَیْكَ لِاَقْتُلَكَ  اِنِّیْۤ اَخَافُ اللهَ رَبَّ الْعٰلَمِیْنَ...

"যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল, কিন্তু তাদের একজনের পক্ষ থেকে তা কবুল করা হল এবং অপরজনের পক্ষ থেকে কবুল করা হয়নি। সে বলল, আমি অবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো মুত্তাকীদের থেকেই কবুল করে থাকেন। তুমি যদি আমাকে হত্যা করার জন্যে আমার দিকে তোমার হাত বাড়িয়ে দাও, তবুও আমি তোমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে তোমার দিকে আমার হাত বাড়াব না। আমি অবশ্যই বিশ্বজগতের প্রভু আল্লাহকে ভয় করি। অবশ্যই আমি চাই, তুমি আমার পাপ এবং তোমার পাপ বহন কর, এরপর তুমি দোজখিদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও। আর এটাই জালেমদের শাস্তি। অবশেষে তার মন তাকে ভাই-হত্যার বিষয়ে প্ররোচিত করল, এরপর সে তাকে হত্যা করল। ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। [সূরা মায়িদা- ৫ : ২৭-৩০]

পবিত্র কুরআনের বর্ণনানুসারে, এই হচ্ছে পৃথিবীতে সংঘটিত প্রথম হত্যাকান্ড। পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম অপরাধ। প্রথম এই হত্যাকান্ডের পেছনের কারণও আমরা উপরোক্ত আয়াতসমূহে দেখতে পাই, ‘তোমার কুরবানী কবুল হয়েছে আর আমারটি হয়নি’এই চিন্তা থেকেই কাবীলের মনে হিংসা জমাট বাঁধতে থাকে আর এর পরিণতিতেই সে তার ভাই হাবীলকে হত্যা করে। যে হিংসা মানুষকে দিয়ে পৃথিবীতে পাপের সূচনা করাল, সে-ই হিংসা জগতে আরও কত শত-সহস্র অনিষ্ট ঘটিয়েছে তার হিসাব কে জানে!

ফলাফল তো এই আকাশের প্রথম অপরাধ আর জমিনের প্রথম অপরাধ সবটার মূলেই এই হিংসা। এর জঘন্যতা তাই আর বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। 

★★★হিংসার রূপরেখা-

হিংসা হচ্ছে অন্যের ভালো কোনো কিছু দেখে তা ধ্বংস হওয়া বা হারিয়ে যাওয়ার কামনা করা। কেউ ভালো পথে চলতে থাকলে কিংবা ভালো কোনো কাজ করতে গেলে সেখান থেকে সে ফিরে আসা, বাধাগ্রস্ত হওয়া কিংবা ব্যর্থ হওয়ার কামনা করা। এগুলোই হিংসা। এসব হচ্ছে হিংসার প্রথম ধাপ। এর একটা পর্যায় অবশ্য মানুষের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। অনেকটাই সৃষ্টিগত ও স্বভাবজাত। আল্লাহ তা'আলা তো বলেই দিয়েছেন

وَ اُحْضِرَتِ الْاَنْفُسُ الشُّحَّ.

মানুষকে কৃপণতাপ্রবণ করেই সৃষ্টি করা হয়েছে। [সূরা নিসা ৪:১২৮] এ কৃপণতার প্রভাবে মানুষ যেমন অন্য কাউকে নিজের সম্পদ দিতে চায় না, ঠিক এ কার্পণ্যের কারণেই ‘অন্য কেউ ভালো অবস্থায় থাকুক এটা সে মেনে নিতে চায় না। মানুষের একটি স্বাভাবিক স্বভাব হচ্ছে, সে অবচেতনভাবেই কামনা করে সকল ভালো জিনিস তার কাছে এসে একত্রিত হোক, যাবতীয় অর্থ সম্মান প্রভাব-প্রতিপত্তি তার হাতে চলে আসুক ইত্যাদি। এ কামনার জন্যেই তো তার চাহিদা সবসময় ঊর্ধ্বমুখী। চাওয়া শেষ হয় না কখনো। এক চাহিদা পূর্ণ হল তো আরেক চাহিদা এসে হাজির। এক লক্ষ্য অর্জিত হল তো আরেক লক্ষ্যের পেছনে অবিরাম ছুটে চলা। এটা স্বাভাবিকতা। এখান থেকেই জন্ম নিয়ে থাকে হিংসা এ সম্মান কিংবা এ পদ অথবা এত এত অর্থ আমার কাছে না এসে তার কাছে কেন? তা আমার কাছে চলে আসুক। তা যদি না হয় কমপক্ষে তার কাছ থেকে হারিয়ে যাক। এটাই হিংসা।

পবিত্র কুরআনের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বনী ইসরাঈল তথা ইহুদী-খ্রিস্টানদের আলোচনা। জাতি হিসেবে তাদের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। তাদেরকে আল্লাহ তাআলা দান করেছিলেন অনেক বড় বড় নিআমত। আম্বিয়ায়ে কেরাম আলাইহিমুস সালামের পবিত্র কাফেলার প্রায় সকলেই ছিলেন বনী ইসরাঈল গোত্রভুক্ত। তাদেরকে দেয়া হয়েছিল আসমানী অনেক কিতাব। কিন্তু এতকিছু পেয়েও তারা শোকরগুজার ছিল না। ছিল না আল্লাহ তা'আলার হুকুমের পূর্ণ অনুগত। তাঁর বিধান তারা লঙ্ঘন করেছে। আসমানী কিতাবে হয়ত বিকৃতি ঘটিয়েছে, কিংবা তার ওপর আমল করা ছেড়ে দিয়েছে। নবীদেরকে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছে। এমনকি তাদের হাতে প্রাণও গেছে অনেক নবীর। পরিণামে তারা আমাদের কাছে আজ আলোচিত অভিশপ্ত এবং আল্লাহর গজবে নিপতিত জাতি হিসেবে। তাদের কিতাবসমূহে শেষ নবীর কথা ছিল। তাঁর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের বিবরণ ছিল। হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তাআলা যখন শেষ নবী হিসেবে পাঠালেন, তখন তারা তাঁকে চিনতেও পারল। সে চেনাও কেমন? পবিত্র কুরআনের বর্ণনানুসারে নিজের সন্তানকে মানুষ যতটুকু শক্তির সঙ্গে চেনে, তাদের চেনা ছিল আরও গভীর, আরও শক্তিমান। কিন্তু তা সত্ত্বেও কেবলই ইসরাঈলী না হওয়ার কারণে তারা একদিকে তাঁর নবুওত মেনে নিতে অস্বীকার করে। উপরন্তু যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, হযরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শেষ নবী হিসেবে মেনে নিয়েছে, তারা যেন এ সঠিক ও সরল পথ ছেড়ে আগের ভ্রান্ত ও বাঁকা পথে ফিরে যায় তারা সে কামনাও করত। এর মূলে ছিল কেবলই হিংসা সঠিক দ্বীন আমরা মানি না তো তারা মানবে কেন? পবিত্র কুরআনের ভাষায়-

وَدَّ كَثِیْرٌ مِّنْ اَهْلِ الْكِتٰبِ لَوْ یَرُدُّوْنَكُمْ مِّنْۢ بَعْدِ اِیْمَانِكُمْ كُفَّارًا   حَسَدًا مِّنْ عِنْدِ اَنْفُسِهِمْ مِّنْۢ بَعْدِ مَا تَبَیَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ.

"আহলে কিতাবদের অনেকেই তাদের নিকট সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও হিংসাবশত কামনা করে তোমাদের ঈমান আনার পরও যদি তারা তোমাদের কাফের  অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারত!" [সূরা বাকারা ২:১০৯]

আরেকজনের কোনো নিআমত দেখে তা বিলুপ্তির কামনা করা হিংসার প্রথম ধাপ।  এর পরের ধাপ হচ্ছে, মনে যখন কারও প্রতি হিংসা জন্ম নেয় তখন এর চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা। তা হতে পারে তার কোনো ক্ষতি করার মধ্য দিয়ে, হতে পারে তার কোনো ক্ষতিতে আনন্দ প্রকাশের মধ্য দিয়ে। এসব যেহেতু তার কর্ম। তাই এর কারণে সে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে। জবাবদিহিতার মুখোমুখি হবে তখনো, যদি সে তার হিংসার কথা মুখে প্রকাশ করে ফেলে। যতটুকু মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়, অর্থাৎ অনিচ্ছাকৃতভাবে কারো প্রতি হিংসার ভাব উদ্রেক হওয়া তাতে গোনাহ হবে না। তবে গোনাহ হোক আর নাই হোক, হিংসা অবশ্যই মানব চরিত্রের একটি মন্দ দিক। মনের হিংসার দাবিতে কেউ যদি অন্যায় আচরণ করে, ক্ষতি করার সুযোগ খোঁজে তাহলে তা যে নিন্দনীয় তা কে অস্বীকার করবে? হিংসা যে মানুষকে অন্যায়ে উৎসাহিত করে তাও জানা কথা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শিখিয়েছেন হিংসুকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে। আল্লাহ তায়লা বলেন-

وَ مِنْ شَرِّ حَاسِدٍ اِذَا حَسَدَ.

"এবং (আমি আশ্রয় চাই) হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।" [সূরা ফালাক-৭১১৩:৫]

আর যদি বিষয়টি এ পর্যায়ে না গড়ায়, হিংসা কারও মনের গভীরেই লালিত হতে থাকে, তাহলে তাও নিন্দনীয়। আরবী ভাষার উক্তি-

الحاسد يحترق بنار الحسد.

অর্থাৎ হিংসুক হিংসার আগুনে জ্বলে। কারণ হিংসা কারও কোনো ক্ষতি করতে পারে না। যাকে এগিয়ে যেতে দেখে কেউ হিংসা করছে, সে তো এগিয়েই যায়। হিংসা তার এগিয়ে চলার গতি রোধ করতে পারে না। কারও মনে সৃষ্ট হিংসা যদি অন্য কারও নিআমতকে বিনাশ করতে পারত, তাহলে তো জগতের কেউই ভালো কিছু হাছিল করতে পারত না। দাঁড়াতে পারত না কারও সম্মান প্রতিপত্তি সুনাম যশ খ্যাতি সুসন্তান অর্থ বিদ্যাবুদ্ধি দ্বীনদারী পরহেজগরি কিছুই। কথায় বলে না শকুনের দুআয় গরু মরে না! আত্মচিন্তায় বিভোর শকুনের কামনা যেমন গরুর মৃত্যু ডেকে আনে না, তেমনি হিংসুকের হিংসাও কারও নিআমত ছিনিয়ে নিতে পারে না। হিংসাকে অগ্রাহ্য করে প্রতিনিয়ত যখন কেউ এগিয়ে চলে তখন বাড়তে থাকে হিংসার আগুন। সে আগুনে জ্বলে পুড়ে ছাই হতে থাকে হিংসুকের অন্তর। কথা হল, হিংসার আগুন কি শুধু হিংসুকের অন্তরকেই জ্বালায়? নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস থেকে আমরা এর উত্তর পাই-

إِيّاكُمْ وَالْحَسَدَ فَإِنّ الْحَسَدَ يَأْكُلُ الْحَسَنَاتِ كَمَا تَأْكُلُ النّارُ الْحَطَبَ أَوْ قَالَ الْعُشْبَ.

"তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থেকো। কারণ হিংসা নেক আমলসমূহকে গ্রাস করে নেয়, যেভাবে আগুন গ্রাস করে লাকড়ি (অথবা ঘাস)। [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯০৫]

শুকনো ঘাস আর লাকড়ি যেমন আগুনের সামনে অসহায়, হিংসার আগুনের সামনে মানুষের নেক আমলও তেমনি অসহায়। হিংসার আগুন গ্রাস করে নেয় ব্যক্তির যাবতীয় নেক আমল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেক হাদীসে হিংসাকে তুলনা করেছেন পানির সঙ্গে। দুই হাদীসের দুই উপমা বাহ্যত বিপরীতমুখী মনে হলেও এ বিবেচনায় তো অবশ্যই এক আগুন যেমন লাকড়ি আর ঘাসকে জ্বালিয়ে শেষ করে দেয়, পানিও তেমনি আগুনকে নিভিয়ে দেয় মুহূর্তেই। আগুনের সামনে লাকড়ি আর ঘাসের প্রাচুর্য যেমন কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়, পানির সামনেও আগুনের বিশালতা উল্লেখ করার মতো কিছু নয়। 

হিংসা তাই সর্বাবস্থায় পরিত্যাজ্য। এ হিংসা কোনো মুমিনের চরিত্র হতে পারে না। হাদীসের বক্তব্য এমনই-

لَا يَجْتَمِعَانِ فِي قَلْبِ عَبْدٍ الْإِيمَانُ وَالْحَسَدُ.

কোনো বান্দার হৃদয়ে ঈমান ও হিংসা একত্রিত হতে পারে না। [সুনানে নাসাঈ, হাদীস ৩১০৯]

★★★ হিংসার ভালো দিক-

অবশ্য হিংসার একটি রূপ এমনও, যেখানে কারও অমঙ্গল কামনা নেই। কারও ভালো কোনো কিছু দেখে তার বিনাশ নয়, বরং নিজের জন্যেও অর্জিত হোক অনুরূপ ভালো ও কল্যাণ এই কামনা রয়েছে সেখানে। প্রথমটিকে আরবীতে বলে ‘হাসাদ’ আর পরেরটিকে বলা হয় ‘গিব্তা’, বাংলায় যাকে আমরা বলি ‘ঈর্ষা’। এই ঈর্ষা দোষণীয় কিছু তো নয়ই, বরং ক্ষেত্রবিশেষে প্রশংসনীয়ও। ঈর্ষা অনেক সময় আমলের আগ্রহ সৃষ্টি করে। নেক কাজে উদ্ধুদ্ধ করে। ভালো কাজে ও কল্যাণকর ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। মুমিন বান্দা যখন কাউকে বারবার হজ্ব-উমরা পালন করতে দেখে কিংবা অল্প বয়সে কাউকে বায়তুল্লাহ যিয়ারতের সৌভাগ্য হাসিল করতে দেখে, সে তখন আবেগে আপ্লুত হয়, তার মনে ঈর্ষা জন্ম নেয় এ সৌভাগ্য যদি আমারও হাসিল হতো! এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ: «لَا حَسَدَ إِلَّا عَلٰى اِثْنَيْنِ: رَجُلٌ اٰتَاهُ اللّٰهُ الْقُرْاٰنَ فَهُوَ يَقُومُ بِه اٰنَاءَ اللَّيْلِ وَاٰنَاءَ النَّهَارِ وَرَجُلٌ اٰتَاهُ اللّٰهُ مَالًا فَهُوَ يُنْفِقُ مِنْهُ اٰنَاءَ اللَّيْلِ وَاٰنَاءَ النَّهَارِ». (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ)

"আবদুল্লাহ ইবনু ‘উমার থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দু’টি ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে ঈর্ষা করা যায় না। প্রথম, সে ব্যক্তি যাকে আল্লাহ কুরআনের (‘ইলম) দান করেছেন, আর সে তা দিন-রাত অধ্যয়ন করে। দ্বিতীয়, ঐ ব্যক্তি যাকে আল্লাহ ধন-সম্পদ দান করেছেন এবং তা সে সকাল সন্ধ্যায় দান করে।" (বুখারী, মুসলিম)

★★★হিংসার কুফল-

যে হিংসা নিন্দনীয়, যে হিংসা তিলে তিলে ধ্বংস করে দেয় আমাদের যাবতীয় অর্জন, আগুনের মতোই গ্রাস করে নেয় আমাদের নেক আমল, যা পানির মতো নিভিয়ে দেয় ঈমান ও আমলের নূর। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ঠ্রে সর্বত্র বিরাজ করে ফিৎনা,ফসাদ, মারা-মারী, দাঙ্গা, হাঙ্গামাসহ সকল ধরণের অপকর্ম। একজন হিংসুক কখনো সুখি হতে পরেনা। অন্যের ভালো দেখে যখন কোনো মানুষের মনে হিংসা আসে তখন সে সব সময় পেরেশানিতে থাকে, অস্বস্তিভোদ করে, নিজে ভালো কোনো কিছু করতে পারেনা, নিজের অনেক কিছু হারায়, এমনকি নিজে নিঃস্ব হয়ে যায়। রাসুল (সা:) বলন-

إِنَّ الْحَسَدَ يُطْفِئُ نُورَ الْحَسَنَاتِ وَالْبَغْىُ يُصَدِّقُ ذَلِكَ أَوْ يُكَذِّبُهُ وَالْعَيْنُ تَزْنِي وَالْكَفُّ وَالْقَدَمُ وَالْجَسَدُ وَاللِّسَانُ وَالْفَرْجُ يُصَدِّقُ ذَلِكَ أَوْ يُكَذِّبُهُ ‏.‏

"নিশ্চয়ই হিংসা নেক কাজের নূরকে নিভিয়ে দেয় এবং স্বৈরাচার তাকে সত্যে বা মিথ্যায় পরিণত করে। চোখ যেনা করে এবং হাত-পা, শরীর, জবান ও লজ্জাস্থান তাকে বাস্তবায়িত করে অথবা ত্যাগ করে।" [ সুনানে আবু দাউদ-৪৯০২]

হিংসা করতে রাসুল (সা:) নিষেধ করেছেন। রাসুল (সা:) বলেন-

 عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ "‏ لاَ تَحَاسَدُوا وَلاَ تَبَاغَضُوا وَلاَ تَجَسَّسُوا وَلاَ تَحَسَّسُوا وَلاَ تَنَاجَشُوا وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا ‏"‏ ‏.‏

"আবূ হুরাইরাহ্‌ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: তোমরা পরস্পরকে হিংসা করবে না, একে অপরের সাথে শত্রুতা পোষণ করবে না, সুপ্তদোষ সন্ধান করবে না, গুপ্ত ভুল-ভ্রান্তি অনুসন্ধান করো না এবং পরস্পরকে ধোঁকায় ফেলবে না। আর তোমরা আল্লাহর বান্দা হিসেবে ভ্রাতৃ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকো।"(সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৬৪৩২)

তিনি আরো বলেন-

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رضي الله عنه، أَنَّ رَسُولَ الله صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «لاَ تَبَاغَضُوا، وَلاَ تَحَاسَدُوا، وَلاَ تَدَابَرُوا. وَكُونُوا عِبَادَ الله إِخْوَاناً. وَلاَ يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَهْجُرَ أَخَاهُ فَوْقَ ثَلاَثَةِ أَيَّامٍ» .

"আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করো না, পরস্পর হিংসা করো না, পরস্পর বিরুদ্ধাচরণ করো না। তোমরা সবাই আল্লাহ্‌র বান্দা ভাই ভাই হয়ে থেকো। কোন মুসলিমের জন্য তিন দিনের অধিক তার ভাইকে পরিত্যাগ করে থাকা জায়িয নয়।"(বুখারী, হাদীস নং ৬০৬৫)

 অন্য হাদিসে এসেছে-

  عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ - صلى الله عليه وسلم -: «لَا تَحَاسَدُوا وَلَا تَنَاجَشُوا، وَلَا تَبَاغَضُوا، وَلَا تَدَابَرُوا، وَلَا يَبِعْ بَعْضُكُمْ عَلَى بَيْعِ بَعْضٍ، وَكُونُوا عِبَادَ اللَّهِ إِخْوَانًا، الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ، لَا يَظْلِمُهُ، وَلَا يَخْذُلُهُ، وَلَا يَحْقِرُهُ، التَّقْوَى هَا هُنَا، -وَيُشِيرُ إِلَى صَدْرِهِ ثَلَاثَ مِرَارٍ-، بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ، كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ، دَمُهُ، وَمَالُهُ، وَعِرْضُهُ» 

"আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না, (ক্রয় করার ভান করে) মূল্য বৃদ্ধি করে ধোঁকা দিও না। একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে না। একে অপরকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন (অবজ্ঞা প্রকাশ) করবে না। তোমাদের একজনের সাওদা করা শেষ না হলে ঐ বস্তুর সাওদা বা কেনা-বেচার প্রস্তাব করবে না। হে আল্লাহ্‌র বান্দাগণ! তোমরা পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার উপর অত্যাচার করবে না, অসম্মান করবে না, তুচ্ছ ভাববে না। ‘ধর্ম ভীরুতা এখানে’-এটা বলার সময় তিনি স্বীয় বক্ষস্থলের প্রতি তিনবার ইঙ্গিত করেছিলেন। কোন মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ জ্ঞান করাটা মন্দ ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট (অর্থাৎ এরূপ তুচ্ছ জ্ঞান প্রদর্শন দ্বারা পাপ কার্য হওয়া সুনিশ্চিত।) এক মুসলমান অন্য মুসলমানকে খুন করা, তাঁর মাল গ্রাস করা ও সম্মানে আঘাত দেয়া হারাম।" [বুখারী-১৬০৬]

★★★হিংসা মনে আসলে করণীয়-

কারও মনে যখন তা দেখা দেবে তখন তা প্রতিহত করার উপায় কী? অন্য সকল ক্ষেত্রের মতো এখানেও প্রিয় নবীজীর প্রিয় কথামালাই তো আমাদের জন্যে চূড়ান্ত নির্দেশনা। এক হাদীসে তিনি বলেছেন-

دَبّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الأُمَمِ قَبْلَكُمْ: الحَسَدُ وَالبَغْضَاءُ...

পূর্ববর্তী জাতিসমূহের রোগব্যাধি তোমাদের কাছেও এসে পৌঁছেছে। তা হল হিংসা-বিদ্বেষ। এটা মুন্ডিয়ে দেয়। আমি চুল মুন্ডানোর কথা বলছি না। বরং তা দ্বীনকে মুন্ডয়ে দেয়। যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ, যতক্ষণ তোমরা ঈমান না আনবে ততক্ষণ জান্নাতে যেতে পারবে না। আর যতক্ষণ পরস্পরে ভালোবাসা সৃষ্টি না হবে ততক্ষণ তোমাদের ঈমানও পূর্ণ হবে না। আমি তোমাদের বলে দিই কীসের মাধ্যমে তা অর্জিত হবে? তোমরা তোমাদের মাঝে সালামের প্রসার ঘটাও। (জামে তিরমিযী, হাদীস ২৫১০)

রাসুল (সা:) আরো বলেন-

عَنْ عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّهَا قَالَتْ كَانَ إِذَا اشْتَكَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَقَاهُ جِبْرِيلُ قَالَ بِاسْمِ اللَّهِ يُبْرِيكَ وَمِنْ كُلِّ دَاءٍ يَشْفِيكَ وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ وَشَرِّ كُلِّ ذِي عَيْنٍ ‏.‏

"রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর স্ত্রী আয়িশাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেছেনঃ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অসুস্থ হয়ে পড়লে জিব্‌রীল (‘আঃ) এ দু’আ পড়ে তাঁকে ফুঁকে দিতেন, তিনি বলতেন, আল্লাহ্‌র নামে-তিনি আপনাকে (ব্যাধি) সুস্থতা দান করুন, সব ব্যাধি থেকে আপনাকে মুক্ত করুন, আর হিংসুকের অনিষ্ট থেকে এবং যখন সে হিংসা করে এবং সকল প্রকার কুদৃষ্টি ব্যক্তির ক্ষতি হতে।" 

 অন্য হাদিসে এসেছে-

وَعَنْ أَبِي سَعِيدٍ الخُدْرِي  أَنَّ جِبرِيلَ أتَى النَّبيَّ  صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم  فَقَالَ : يَا مُحَمَّدُ اشْتَكَيْتَ ؟ قَالَ  نَعَمْ قَالَ : بِسْمِ الله أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللهُ يَشْفِيكَ بِسمِ اللهِ أُرقِيكَ- رواه مسلم

"আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত,জিবরীল নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর নিকট এসে বললেন, ‘হে মুহাম্মাদ! আপনি কি অসুস্থ?’ তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” জিবরীল তখন এই দু‘আটি পড়লেন-

بِسْمِ الله أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللهُ يَشْفِيكَ بِسمِ اللهِ أُرقِيكَ-

অর্থাৎ,আমি তোমাকে আল্লাহর নাম নিয়ে প্রত্যেক কষ্টদায়ক বস্তু থেকে এবং প্রত্যেক আত্মা অথবা বদনজরের অনিষ্ট থেকে মুক্তি পেতে ঝাড়ছি। আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করুন। আল্লাহর নাম নিয়ে তোমাকে ঝাড়ছি।" (মুসলিম ৫৮২৯)

মনকে হিংসামুক্ত রাখার জন্যে প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এ দুআটিও উল্লেখযোগ্য-

رَبِّ تَقَبّلْ تَوْبَتِى وَاغْسِلْ حَوْبَتِى وَأَجِبْ دَعْوَتِى وَثَبِّتْ حُجّتِى وَاهْدِ قَلْبِى وَسَدِّدْ لِسَانِى وَاسْلُلْ سَخِيمَةَ قَلْبِى.

"প্রভু আমার! আপনি আমার তওবা কবুল করুন, আমার পাপরাশি ধুয়ে দিন, আমার ডাকে সাড়া দিন, আমার দলীল-প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করুন, আমার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমার যবানকে সঠিক রাখুন আর আপনি আমার অন্তরের যাবতীয় কলুষতা দূর করে দিন।" [সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫১২]

★★★হিংসামুক্ত মানুষ স্বচ্ছ- 

রাসুল (সা:) বলেন-

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ قِيْلَ لِرَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم أَىُّ النَّاسِ أَفْضَلُ قَالَ كُلُّ مَخْمُوْمِ الْقَلْبِ صَدُوْقِ اللِّسَانِ. قَالُوْا صَدُوْقُ اللِّسَانِ نَعْرِفُهُ فَمَا مَخْمُوْمُ الْقَلْبِ قَالَ هُوَ التَّقِىُّ النَّقِىُّ لاَ إِثْمَ فِيْهِ وَلاَ بَغْىَ وَلاَ غِلَّ وَلاَ حَسَدَ.

"আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলা হল, সবচেয়ে ভাল মানুষ কে? তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক হিংসা-বিদ্বেষ মুক্ত অন্তরের অধিকারী এবং সত্য কথার অধিকারী ব্যক্তি সবচেয়ে উত্তম মানুষ’। ছাহাবীগণ বললেন, আমরা সত্য কথার অধিকারী জানি। কিন্তু হিংসা-বিদ্বেষ মুক্ত অন্তর কি জিনিস তা জানি না। তিনি বললেন, যে ব্যক্তি স্বচ্ছ ও পরহেযগার। যার মধ্যে পাপ নেই, পাপ হলেই ক্ষমা চায়; সীমালংঘন নেই; খিয়ানত নেই; হিংসা নেই।" (ইবনু মাজাহ হা/৪২১৬)।

তিনি আরো বলেন-

 عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «ثَلَاثٌ مَنْ لَمْ يَكُنَّ فِيهِ، غُفِرَ لَهُ مَا سِوَاهُ لِمَنْ شَاءَ، مَنْ مَاتَ لَا يُشْرِكُ بِاللَّهِ شَيْئًا، وَلَمْ يَكُنْ سَاحِرًا يَتَّبِعُ السَّحَرَةَ، وَلَمْ يَحْقِدْ عَلَى أَخِيهِ»

"ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,নবী (সাঃ) বলেনঃ কোন ব্যক্তির মধ্যে তিনটি পাপাচার না থাকলে যাকে ইচ্ছা তার অন্য গুনাহসমূহ ক্ষমা করা হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কিছু শরীক না করে মারা গেলো, সে যাদু চর্চাকারী ছিলো না এবং সে তার কোন (মুসলমান) ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেনি।"

অন্য এক হাদিসে এসেছে-

  عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ  لا يَجْتَمِعَانِ فِي النَّارِ اجْتِمَاعًا يَضُرُّ أَحَدُهُمَا صَاحِبَهُ مُسْلِمٌ قَتَلَ كَافِرًا ثُمَّ سَدَّدَ الْمُسْلِمُ وَقَارَبَ وَلاَ يَجْتَمِعَانِ فِي جَوْفِ مُؤْمِنٍ غُبَارٌ فِي سَبِيلِ اللهِ وَفَيْحُ جَهَنَّمَ وَلاَ يَجْتَمِعَانِ فِي جَوْفِ مُؤْمِنٍ الإِيمَانُ وَالْحَسَدُ

"আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত,নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, “যে মুসলিম কোন কাফেরকে হত্যা ক’রে নিজেও সঠিক পথে চলেছে, সে এবং ঐ কাফের জাহান্নামে একত্রিত হবে না। কোন মু’মিনের অন্তরে আল্লাহর পথের ধুলা এবং জাহান্নামের উত্তাপ একত্রিত হবে না। অনুরূপ কোন বান্দার অন্তরে ঈমান ও হিংসা একত্রিত হতে পারে না।” (নাসাঈ-৩১০৯)

★★★হিংসার প্রতিকার-

১। হিংসা অন্তরের বড় একটি রোগ, এটাকে সব সময় খারাপ মনে করা। 

২। প্রয়োজন অনুপাতে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করা। 

৩। বিনয়ী হওয়া এবং লোকজনের দুঃখ-কষ্টে সহানুভূতি প্রকাশ করা। 

৪। নিন্দা-সমালোচনার পরিবর্তে প্রশংসা করার চেষ্টা করা। 

৫। বেশি বেশি সালাম প্রদান করা। 

৬। হাদিয়া-উপহার প্রদান করা।

৭। বেশী বেশী কুরআন তেলাওয়াত করা।

৮। সবর করা ও দান করা।

★★★যার প্রতি হিংসা করা হয়েছে তার করণীয়-

১। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের প্রতি যখন দুষ্ট লোকেরা হিংসা করেছে, তখন তাঁদের কর্ম কি ছিল তা স্মরণ করা। 

২। বেশিবেশি আল্লাহর কাছে দুষ্টলোকের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া। বেশি বেশি সূরা ফাতিহা, নাস, ফালাক, আয়াতুল কুরসি পাঠ করা। হাদীসে বর্ণিত এ দোয়াটি পড়া: ‘আউযু বিকালিমা’তিল্লাহিত তা’ম্মাতি মিন শার্রি মা খলাক।’ অর্থঃ ‘আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালেমার দ্বারা তাঁর নিকট তাঁর সৃষ্টির অনিষ্ট হতে আশ্রয় চাই।’ (মুসলিম ৬৭৭২)

লেখক: মুফতি মুহাম্মদ আল-আমিন

প্রভাষক (আরবি), হযরত শাহজালাল ফাযিল মাদরাস,

ওসমানীনগর, সিলেট।






মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

রাসুল (সা:) জন্ম ও বংশ পরিচয়।

শাওয়াল মাসের ফযিলত

মাসবুকের নামাযের নিয়ম কি?