দ্বীনী ইলম শিক্ষার গুরুত্ব ও ফযিলত
দ্বীনী ইলম শিক্ষার গুরুত্ব ও ফযিলত
মুহাম্মদ আল- আমিন
আল্লাহ তা'য়ালা মানব জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার লক্ষ্যে যুগে যুগে নাবী-রাসূলগণ প্রেরণ করেছেন। প্রেরিত নাবী-রাসূলগণের নিকট আল্লাহ তা'য়লা হেদায়েতের যে বাণী পাঠিয়েছেন তাকে বলা হয় ওহী। ওহী বলতে কুরআন ও সুন্নাহ দু'টোকেই বুঝানো হয়ে থাকে। কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানব জাতির জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ। তাই কুরআন-সূন্নাহর জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য অতিব জরুরী। কারণ একমাত্র ওহীভিত্তিক জ্ঞানার্জনের মাধ্যমেই ইসলামি শরীয়ার হালাল-হারাম, করনীয় ও বর্জনীয়সহ সকল বিধি-বিধান জানা সম্ভব হতে পারে। তাই কুরআন-সুন্নাহর আলোকে দ্বীনী ইলম শিক্ষার গুরুত্ব ও ফযিলাত সম্পর্কে সংক্ষপে আলোচনা তুলে ধরা হলো।
আল্লাহ তা'য়লা বলেন-
* اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ-
"পড়ো তোমার প্রভূর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন ।" ইসলাম ধর্মের আগমনে পৃথিবীবাসী মানুষের জন্য জাগতিক ও পারলৌকিক সকল প্রকার শিক্ষার দ্বার উম্মুক্ত হয়েছে। ইসলামের তথা, আল কুরআনের সর্বপ্রথম নাযিলকৃত বাণীটিই হচ্ছে- اقرأ অর্থাৎ, পড়ুন। এখান থেকে অনুধাবন করা যায়, ইসলাম বিশ্বমানবতার জন্য জ্ঞানের দ্বার কিভাবে উম্মুক্ত করে দিয়েছে। সুতরাং জ্ঞানীব্যক্তি ও মূর্খব্যক্তি কখনো সমান হতে পারে না। আল্লাহ তা'য়ালা ইরশাদ করেন-
قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لا يعلمون-
"হে নবী! আপনি বলে দিন, যে ব্যক্তি (কুরআন-সুন্নাহ তথা শরীয়াতের বিধান) জানে আর যে জানে না, তারা কি উভয়ে সমান গতে পারে? তার মানে কখনই সমান হতে পারে না।" যাদেরকে দ্বীনি জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদেরকে বিশেষ মর্যাদা দান করা হয়েছে। আল্লাহ তা'য়লা বলেন-
*يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٌ -
"তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের মধ্য থেকে যাদেরকে দ্বীন ইসলামের জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদেরকে বিশেস সন্মান বা মর্যাদা দান করা হয়েছে।" যারা ওহীর জ্ঞানে জ্ঞানী তথা আলিম, তারাই আল্লাহ তা'য়ালাকে ভয় করেন।
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَماء –
"একমাত্র (ওহীর জ্ঞানে জ্ঞানী) আলিমগণই আমাকে ভয় করে থাকে।" একমাত্র আলিমগণই ভাল-মন্দ ও হক বাতিলের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। আল্লাহ তা'য়লা ইরশাদ করেন-
• وَمَا يَعْقِلُهَا إِلَّا الْعَالِمُونَ-
"একমাত্র আলেমগণই ভাল-মন্দ ও হক-বাতিলের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে।"
ইলম অর্জনের গুরুত্ব অনেক যা একজন লেখক তার লেখনীতে পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরতে অক্ষম। মানুষের জন্য ততটুকু জ্ঞান অর্জন করা ফরজ যতটুকু জ্ঞান অর্জন না করলে আল্লাহ তা'য়লার ইবাদাত করা সম্ভব নহে। রাসুল (সা:) বলেন-
عن أنس بن مالك ( رض) قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم : " طلب العلم فريضة على كل مسلم -
"হযরত আনাস রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) বলেন: ''প্রতিটি মুসলিম পুরুষের উপর দ্বীনী ইলম শিক্ষা গ্রহণ করা ফরজ।''
আল্লাহ যাদেরকে কল্যাণময় করেন তারা হচ্ছেন আলিমগণ। রাসুল (সা:) বলেন-
عن معا وية (رض) قا ل : قا ل رسول الله صلى الله تعالى عليه وسلم : من يرد الله خيرا يفقه فى
الدين -
"মুয়াবিয়া রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) ইরশাদ করেন,আল্লাহ তায়ালা যার জন্য বিশেষ কল্যাণ কামনা করেন, তাকে দ্বীনী জ্ঞান অর্জন ও বুঝার তাওফিক দান করেন।'' রাসুল (সা:) আরো বলন-
عن ايى هريرة ( رض) قا ل : قا ل رسو ل الله صلى الله عليه وسلم : " اذا ما ت الا نسا ن انقطع عنه عمله الا من ثلا ثة الا من صدقة جارية او علم ينتفع به او ولد صالح يدعو له " -
"আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: 'যখন মানুষ মৃত্যু বরণ করে, তখন তার সব আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু তিনটি আমল এমন যার সাওয়াব বন্ধ হয় না।(০১)ছাদক্বায়ে জারিয়া অর্থাৎ- প্রবাহমান ছাদক্বাহ। (০২) এমন ইলম যার দ্বারা জনগণ উপকৃত হয়। (০৩) নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।" রাসুল (সা:) অন্যত্র বলন-
"তাবেয়ী কাছির ইবনু ক্বায়েছ (র:)বলেন,আমি দামেশকের মসজিদে বিশিষ্ট সাহাবী আবুদ্দারদাহ (রা:) এর সাথে বসা ছিলাম, এমন সময় তার নিকট জনৈক ব্যক্তি এসে বলেন, হে আবুদ্দারদাহ! আমি সুদূর মদিনাতুর রাসূল থেকে আপনার নিকট শুধু একটি হাদীস শুনার জন্য এসেছি। আপনি নাকি উহা রাসুল (সা:) হতে বর্ণনা করে থাকেন। তখন আবুদ্দারদাহ (রা) বলেন, আমি রাসুল (সা:) বলতে শুনেছি: তিনি বলেন; যে ব্যক্তি ইলম আন্বেষণ করার লক্ষ্যে কোন পথ অবলন্বন করে, আল্লাহ তা'য়ালা এর বিনিময়ে তাকে জন্নাতের পথ সমূহের মধ্য থেকে একটি পথে পৌছিয়ে দেন এবং ফেরেস্তাগণ ইলম অন্বেষণকারীদের সন্তুষ্টির জন্য তাদের নিজেদের পাখা বিছিয়ে দেন। এতদ্ব্যতীত যারা আলেম, তাদের জন্য আকাশ ও পৃথিবীতে যারা আছেন , তারা সকলেই আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা ও দোওয়া করতে থাকেন। এমনকি পানির মধ্যে অবস্থিত মাছসমূহ তাদের জন্য দোওয়া করে থাকেন। আলেমের ফজিলাত সাধারণ আবেদের (ইবাদতকারী) উপর এমন, যেমন পূর্ণিমার চাঁদের মর্যাদা অন্যান্য তারকারাজির উপর। আর আলিমগণ হচ্ছেন নাবীদের ওয়ারিশ। নাবীগণ কোন দীনার বা দিরহাম ( টাকা-পয়সা ও ধনসম্পদ) রেখে যান না। তারা মিরাছ হিসেবে রেখে যান শুধু ইলম। সুতরাং যে ব্যক্তি ইলম অর্জন করলো সে সৌভাগ্যের পূর্ণ অংশ গ্রহণ করলো।" রাসুল (সা:) আরো বলন-
عن انس (رض) قا ل : قا ل رسول الله صلى الله عليه وسلم : من خرج فى طلب العلم فهو فى سبيل الله -
"হযরত আনাস (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সা:) বলেছেন: 'যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণের লক্ষ্যে নিজ বাড়ি থেকে বের হলো, সে প্রত্যাবর্তন না করা পর্যন্ত আল্লাহর রাস্তায় রয়ে গেল।’'
পরিশেষে আমরা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে এ প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদেরকে দুনিয়া এবং আখেরাতের প্রয়োজনীয় উপকারী প্রত্যেক বিষয়ের যথাযথ জ্ঞান অর্জনের তাওফিক দান করেন। বিশ্ব মানবতার সামগ্রিক কল্যানে আমাদের জ্ঞানকে কাজে লাগানোর তৌফিক দান করেন। আমিন।।
লেখক পরিচিতি :-
প্রভাষক(আরবি),
হযরত শাহজালাল ফাযিল মাদরাসা,ওসমানীনগর, সিলেট।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন