আখেরি চাহার শোম্বা
আখেরি চাহার শোম্বা
মুফতি মুহাম্মদ আল-আমিন
আখেরী চাহার শোম্বা হলো মুসলিম উম্মাহের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি স্মারক দিবস। আখেরী চাহার শোম্বা একটি আরবী ও ফার্সি শব্দ-যুগল; এর আরবী অংশ আখেরী, যার অর্থ “শেষ” এবং ফার্সি অংশ চাহার অর্থ "সফর মাস" আর শোম্বা, যার অর্থ “বুধবার”। সতরাং আখেরী চাহার সোম্বা অর্থ - সফর মাসের শেশ বুধবার।
১১ হিজরির শুরুতে রসূলুল্লাহ (স) গুরতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ক্রমেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে, নামাজের ইমামতি পর্যন্ত করতে পারছিলেন না। ২৮ সফর বুধবার মহানবী (স) সুস্থ হয়ে ওঠেন। দিনটি ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার।
ইবনে হাজার ও ইবনে কাসির একে বৃহস্পতিবারের ঘটনা বলেছেন। বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৪/১৯৩
কেহ কেহ বলেন, এ তথ্যও সঠিক নয় যে বুধবারের পর রাসুল (সা.) আর গোসল করেননি। কেননা এরপর এক রাতে এশার নামাজের আগে গোসল করার কথা সহিহ হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে। (মুসলিম, হাদিস : ৪১৮, বুখারি, হাদিস : ৬৮১)। আর এ কথাও ঠিক নয় যে বুধবারের পর সুস্থতায় কোনোরূপ উন্নতি হয়নি। বরং এরপর আরেক দিন সুস্থবোধ করেছিলেন এবং জোহরের নামাজে শরিক হয়েছিলেন। (বুখারি , হাদিস : ৬৬৪, ৬৮০, ৬৮১, মুসলিম, হাদিস : ৪১৮) এমনকি সোমবার সকালেও সুস্থবোধ করেছিলেন। যার কারণে হজরত আবু বকর (রা.) অনুমতি নিয়ে নিজ ঘরে চলে গিয়েছিলেন। (সিরাতে ইবনে ইসহাক পৃ. ৭১১-৭১২, আর রাওজাতুল উলুফ : ৭/৫৪৭-৫৪৮)
মোহাম্মদ (সা.)-এর কী অসুখ হয়েছিল, তা নিয়ে দুটি বিবরণ পাওয়া যায়-
১.ইবনে ইসহাক তার সিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) গ্রন্থে দাবি করেন, মোহাম্মদ (সা.) বাকিউল গারকাদের কবরস্থান থেকে ফিরে প্রচণ্ড শিরপীড়ায় আক্রান্ত হন।
২.অন্যদিকে সিরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার ইবনে হিশাম তার সিরাতুন নবী (সা.) গ্রন্থে বলেন, মোহাম্মদ (সা.) তার অন্তিম যাত্রায় প্রচণ্ড মাথাব্যথায় আক্রান্ত হন। মূলত মোহাম্মদ (সা.) প্রচণ্ড শিরপীড়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে অসহ্য মাথাব্যথা অনুভব করেন। ওই মাথাব্যথা এতটা মারাত্মক ছিল, তিনি তার অন্তিমযাত্রার অধিকাংশ সময় অজ্ঞান ছিলেন। একটু সুস্থ হলেও আবার জ্ঞান হারাতেন।
হজরত আয়শা সিদ্দিকা (রা.) বলেন, একদিন রাতে হুজুর (সা.) কবর জিয়ারতের জন্য বের হলেন। আমিও তাঁর পেছন পেছন গেলাম। আমার সন্দেহ হলো, তিনি বোধহয় আমার হক অন্য কাউকে দিয়ে দেবেন। কিন্তু না, তিনি দীর্ঘ সময় কবরবাসীর জন্য দোয়া করলেন। হুজুর (সা.) যখন ঘরে ফিরে এলেন আমিও ঘরে ফিরে এলাম। আমি চাইছিলাম, তাঁকে অনুসরণ করার বিষয়টি যেনো তিনি বুঝতে না পারেন। কিন্তু আমাকে হাঁপাতে দেখে ঠিকই বুঝে ফেললেন আমি তার পেছন পেছন গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে বললেন, আয়শা! তোমার সন্দেহ ভুল ছিলো। ঠিক এমন সময়ই হযরতের (সা.) মাথা ব্যথা শুরু হয়। প্রচন্ড মাথা ব্যথা তার ওপর ভীষণ জর নিয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলেন হযরত। তিনি বারবার বলছিলেন, এ আমার শেষ যাত্রার অসুখ। আল্লাহতায়ালা তার নবীদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তাই তাদেরকে তিনি সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় করেন। তবে অন্য সব নবী যত কষ্ট পেয়েছেন আমি তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি কষ্ট পাচ্ছি। হযরতের (সা.) কষ্ট সবাইকেই কষ্ট দিচ্ছিলো। সবাই ধরেই নিয়েছে এবার আর তিনি সুস্থ হবেন না।
আবিসিনিয়া থেকে আনা ওষুধ খাওয়ানো হলেও অবস্থার কোনও পরিবর্তন হয়নি। কিছুক্ষণ ভালো থাকলেও পরমুহূর্তে তিনি জ্ঞান হারাতেন।
এ অবস্থায় মোহাম্মদ (সা.)-এর পরিবারের সদস্য ও সাহাবীরা তার বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দেন। ওই নিরাশার মধ্যেই একদিন মোহাম্মদ (সা.) আশার আলো জ্বালালেন। তিনি এক সকালে জ্ঞান ফিরে পেলেন। অনেকটা সুস্থ স্বাভাবিক আচরণ শুরু করেন। সাত কুয়োর জল দিয়ে গোসল করেন। নবী কন্যা ফাতেমা (রা.) এবং দুই নাতি হাসান (রা.) ও হোসেনকে (রা.) সঙ্গে নিয়ে দুপুরের খাবার খান।
আয়েশা রাঃ. বলেন, রাসূল (সা.) যখন আমার ঘরে প্রবেশ করলেন এবং তাঁর অসুস্থতা বৃদ্ধি পেলে তিনি বললেন, তোমরা আমার ওপর ৭ মশক পানি ঢালো, যেন আমি আরাম বোধ করি এবং লোকদের মাঝে গিয়ে উপদেশ দিতে পারি। তখন আমরা এভাবে তাঁর দেহে পানি ঢাললাম। এর পর তিনি মানুষের কাছে বেরিয়ে যেয়ে তাদেরকে নিয়ে নামাজ আদায় করলেন এবং তাদেরকে উপদেশ প্রদান করলেন। (সহীহ বুখারী-৪/১৬১৪, ৫/২১৬১)
এই দিন কিছুটা সুস্থবোধ করায় রসূলুল্লাহ (স) গোসল করেন এবং শেষবারের মত নামাজে ইমামতি করেন। মদীনাবাসী এই খবরে আনন্দ-খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন এবং দলে দলে এসে নবী (স) কে একনজর দেখে গেলেন। সকলে তাদের সাধ্যমতো দান-সাদকা করলেন, শুকরিয়া নামাজ আদায় ও দোয়া করলেন। নবীর রোগমুক্তিতে তার অনুসারীরা এতটাই খুশি হয়েছিলেন যে, তাদের কেউ দাস মুক্ত করে দিলেন, কেউবা অর্থ বা উট দান করলেন;যেমনঃ আবু বকর সিদ্দিক (রা) ৫ হাজার দিরহাম, উমর (রা)৭ হাজার দিরহাম, ওসমান ১০ হাজার দিরহাম, আলী (রা) ৩ হাজার দিরহাম, আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা) ১০০ উট দান করেন। আবার কেহ নফল নামায পড়ে দোয়া করেন।
আল্লাহর প্রিয় হাবিব হযরত মুহাম্মদ (স.) এই পৃথিবীতে তেষট্টি বছর হায়াত পেয়েছিলেন। এর মধ্যে কখনোই তিনি বড় ধরনের কোনো রোগ-ব্যাধির কবলে পড়েন নাই। কাফের মুশরিকদের শত অত্যাচার ও নির্যাতনের মাঝেও তিনি ছিলেন হিমাদ্রির ন্যায় অবিচল। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা মুহাম্মদ (স.)কে পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিবেন, তার আগে রোগে আক্রান্ত হলেন তিনি। উম্মুল মু'মেনীনগণও সাহাবা আজমাইনগণ তাতে খুবই বিমর্ষ হয়ে পড়েছিলেন। এটা ছিল সফর মাসের শেষ বুধবার। এরপর বৃহস্পতিবার হতে আবার অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
রসূল (স.)-এর আগে তাঁর পরম বন্ধু আল্লাহর সান্বিধ্যে পৌঁছানোর জন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন। একজন মুসাফির যেমন দূরবর্তী সফরে বের হওয়ার আগে সবার কাছ থেকে বিদায় নেয় সব কিছু গুছিয়ে নেয়- যা দেখে অনুভব করা যায় যে, উনি কোনো সফরে বের হবেন। ঠিক তদ্রূপ মহানবী (স.) তাঁর ইত্তেকালের আগেই তাঁর বিদায় যাত্রার প্রস্তুতি দেখে নিকটতম সাহাবীরা অনুভব করতে পেরেছিলেন যে, রসূল (সা.) বোধহয় আমাদের মাঝে আর বেশিদিন থাকবেন না। উদাহরণস্বরূপ:-
১.রসূল (স.) প্রত্যেক রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফ পালন করতেন। প্রত্যেকবার রমজানে মহানবী (স.)-এর কাছে জিব্রাইল (আ.) আসতেন এবং একবার সমস্ত কুরআন মহানবীকে শুনাতেন। আর মহানবী (সা.)ও সমস্ত কুরআন শরীফ জিব্রাইল (আ.)কে একবার শুনাতেন। কিন্তু ইন্তেকালের বছর জিব্রাইল (আ.) রসূল (স.)কে দুই বার শোনালেন। রসূল (স.) ও জিব্রাইল (আ.)কে দুইবার শোনালেন।
২.বিদায় হজ্বের ভাষণের মাঝে তিনি বললেন, আজকের দিন যেসময় তোমাদের মাঝে আমি একত্রিত হয়েছি। আর হয়ত তোমাদের মাঝে আমি এখানে একত্রিত হতে পারবো না।
৩.তিনি ওহুদের প্রান্তরে চলে গেলেন। সেখানে তাঁর প্রাণপ্রিয় চাচা, ইসলামের বীর সিপাহসালার হয়রত আমীর হামজা ও ওহুদের যুদ্ধে শহীদ হওয়া সত্তরজন জান্নাতী সাহাবীর কবর রয়েছে। রসূল (সা.) তাদের কবর জিয়ারত করলেন।
৪.একদিন জান্নাতুল বাকী কবর স্থানে চলে এলেন। এখানে কবরবাসীদের সম্বোধন করে বললেন, 'আসসালামু আলাইকুম ইয়া দারু কওমি মু'মিমিন। হে মুমিন সমপ্রদায়ের আসল নিবাসের অধিবাসীগণ! আমি অতি শিঘ্রই তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি।
৫.হঠাৎ জিব্রাইল (আ.) আসলেন এবং বললেন, 'হে রসূল (স.) আল্লাহ তায়ালা আপনাকে শীঘ্রই এই পৃথিবী থেকে চলে যাবার অথবা আরো কিছুদিন এখানে থাকার অবকাশ দিয়েছেন। এখন আপনি যেটা পছন্দ করেন।'
মোহাম্মদ (সা.) ও তার মুক্ত ক্রীতদাস আবু সওয়ায় হিবার কথোপকথন থেকে বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায়।
মোহাম্মদ (সা.) যখন মধ্যরাতে বাকিউল গারকাদের কবরস্থানে যান, তখন হিবাও সেখানে গিয়েছিলেন। হিবা বলেন, মোহাম্মদ (সা.) আমাকে দেখে বললেন, ‘আমাকে দুটো বিকল্পের একটি পছন্দ করতে বলা হয়েছে—এই জগতের সব সম্পদের মালখানার চাবি ও দীর্ঘজীবন অথবা বেহেশত, আমার আল্লাহর দিদার এবং তাৎক্ষণিক বেহেশত।’ হিবা বলেন, ‘আমি বললাম, আপনি প্রথমটি পছন্দ করেন।’ তিনি বললেন, ‘আমি দ্বিতীয়টি পছন্দ করেছি।’ অর্থাৎ মোহাম্মদ (সা.) মৃত্যুকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে আল্লাহর দিদার লাভকে বেছে নিয়েছেন। আর এরই পরিপেক্ষিতে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে ওই অসুখে তার জীবনাবসান হবে, তা তার অজানা ছিল না।
প্রিয় পাঠক! আল্লাহর নবী রসূলগণ হলেন জগতের সেরা সন্তান। তাদেরকে আল্লাহ তায়ালা মৃত্যুর আগে ছালাম জানিয়েছেন এবং থাকা ও যাবার স্বাধীনতা দিয়েছেন। কিন্তু সকল নবী যাওয়াটাকেই বেঁছে নিয়েছেন। মহানবী (স.) ও তাই করলেন। তিনি একদিন বলেছিলেন, আল্লাহ তাঁর কোনো এক বান্দাকে এই পৃথিবীতে থাকার ও এখান থেকে যাবার ইখতিয়ার দিয়েছেন। কিন্তু সেই বান্দা বলেছে- 'আল্লাহুম্মা আর রফিকুল আলা।' আমি আমার পরম বন্ধু আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সান্নিধ্যকেই বেঁছে নিচ্ছি। সাহাবীরা বলেন, রসুলের এই কথা শুনে নিকটতম সাহাবী আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, তালহা, যুবারের, আবদুর রহমান বিন আউফ এসব জলিল-এ-ক্বদর সাহাবীরা ডুকরে কেঁদে উঠেছিলেন। তাদের কান্নার শব্দ পিছনের কাতার থেকে শোনা গিয়েছিল। সাহাবীরা বুঝে ছিলেন রসূল (স.) হয়ত আর বেশিদিন আমাদের মাঝে থাকবেন না।
৬.রসূল (স.) আয়শা রা: কে বললেন, আয়শা! খয়বারের ইহুদিনী মহিলার সেই বিষ মিশানো খাবার এখনো আমাকে পীড়িত করছে।
বৃহস্পতিবার আসরের নামায়াজের পর হতে আর মসজিদের জামাতে যেতে পারেননি নবী করীম (স.)। এরপর ধীরে ধীরে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। গোটা মদিনা নগরী নীরব নিস্তব্ধ। সোমবার সুব্হে সাদিকে বেলালের আজান নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে জাগিয়ে দিল সব মানুষকে। রসূল (স.) ইশারায় ফজরের নামাজ আদায় করলেন। হযরত আয়শা (রা.) বললেন, আমার হুজরার বাতি সে সময় নিভে গেল। মহানবী (সঃ)-এর সকল সম্পদ এই মুহূর্তে এমনভাবে শেষ হলো যে, বাতিজ্বালানোর তেলটুকুও ছিল না। অথর্াৎ তাঁর প্রাণপ্রদীপ নিভে যাবার আগেই আলোর প্রদীপ নিভে গেল। হযরত জিব্রাইল (আ.) এসে বললেন, হে রসূল (স.)! আপনাকে আলস্ন্লাহ সালাম দিয়েছেন। রসূল (স.) তখনই ধরাধাম হতে চিরবিদায় নিবেন। মেয়ে ফাতিমা সে সময় খুব কাঁদছিলেন। মহানবী (স.) ফাতেমাকে ডাক দিয়ে কি জানি বললেন। তাঁর কান্না বন্ধ হয়ে গেল। হযরত আয়েশা (রা.) ফাতেমাকে ডেকে বললেন, তোমার আব্বা তোমার কানে কি বললেন, আর তোমার কান্না বন্ধ হয়ে গেল? ফাতেমা বললেন, আব্বাজান আমাকে বলেছেন মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সবার মধ্যে আগে তাঁর সাথে আমার দেখা হবে। এরপর মালাকুল মওত আজরাইল (আ.) আসলেন। আর একটু পরেই জান কবজ হবে। জিব্রাইল (আ.) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রসূল (স.)! আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে। মহানবী (স.) বললেন, হ্যাঁ, মৃত্যুর যন্ত্রণা খুবই কষ্টকর। জিব্রাইল (আ.) বলেন, ইয়া রসূল (স.) পৃথিবীর সব মানুষের চেয়ে কম কষ্টে আপনার জান কবজ করা হচ্ছে। মহানবী (স.) বলেন, আমার তো মনে হচ্ছে ওহুদ পাহাড়টি আমার বুকের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।
এরপর রসূল (স.) আস্-সলাত! আস্-সলাত!! অমা মালাকাত আইমানুকুম। নামাজ! নামাজ!! তোমরা তোমাদের অধীনস্থদের ব্যাপারে সাবধান থাকবে। এই কথা বলতে বলতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে গেলেন।
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানব আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ (স.)। ভোর না হতেই চারদিকে আওয়াজ উঠল: রসূল নেই! রসূল নেই!! সবাই যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। নিকটতম সকল সাহাবী খবর পেয়ে হাজির হলেন। হযরত উসমান একবার হুজরার মধ্যে যান আবার বের হয়ে এসে লোকদের শান্ত করেন। সাহাবী উনায়েস (রা.) বেহুঁশ হয়ে গেলেন। হযরত ওমরের মত বড় বীর পাগলের মতো হয়ে গেলেন। নাঙ্গা তরবারি বের করে বলছিলেন, যে বলবে মুহাম্মদ (স.) নেই, আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব। এ খবর যখন হযরত আবুবকরের কাছে গেলো। তখন তিনি সুনুহ পল্লীতে অবস্থান করছিলেন। হযরত আয়শা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমার পিতা হযরত আবুবকর (রা.) একটি ঘোড়ায় চড়ে এলেন। ঘোড়া হতে নামলেন। কারো সাথে কোন কথা বললেন না। সোজা হুজরায় ঢুকলেন। রসূলের চেহারা হতে কাপড় উঠালেন। ললাটে চুম্বন করলেন। আর বললেন, হে প্রিয় বন্ধু! তুমি সত্যি ইন্তেকাল করেছো। এরপর তিনি মনটাকে হিমাদ্রির মতো শক্ত করে বাইরে এসে বললেন, হে জনমণ্ডলি! তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদের পূজারি তারা শোন, মুহাম্মদ (স.) মারা গিয়েছেন। আর যারা আল্লাহর পূজারি, তারা শোন, সেই আল্লাহ চিরঞ্জীব, অমর। তিনি কখনো মৃত্যু বরণ করবেন না। হে ওমর! ঠাণ্ডা হও। অতঃপর তিনি কোরআনের 'অমা মুহাম্মাদুন ইল্লা রাসূল' আয়াত পাঠ করলেন, যার অর্থ হলো: মুহাম্মদ (স.) একজন রসূল ছাড়া আর অন্য কিছু নন। তার আগে বহু রসূল এসেছিলেন ও তাঁরাও মৃতু্যবরণ করেছেন। সুতারাং যদি মুহাম্মদ (স.) মারা যান, অথবা নিহত হন তাহলে কি তোমরা তোমাদের পূর্বের অবস্থায় (জাহেলিয়াতে) ফিরে যাবে? হযরত ওমর (রা.) বললেন, যখন আবুবকর এই কথাগুলো বলছিলেন ও কুরআনের আয়াত পড়ছিলেন তখন আমার হাত থেকে তরবারি পড়ে গেল। ধীরে ধীরে পা ভারি হতে লাগলো। অবশেষে আমি বেহুঁশ হয়ে পড়ে গেলাম।
আখেরী চাহার সোম্বায় যদি আমরা এ সমস্ত দৃশ্য ও কথাগুলো হূদয়পটে জাগ্রত করতাম তাহলে আমাদের মন-মানসিকতার আমুূল পরিবর্তন ও আলোর উন্মীলনে উদ্ভাসিত হবার কথা ছিল। কিন্তু তা কি হয়? তাই আমরা এবার আখেরী চাহার সোম্বা হতে শপথ নিয়ে রসূলের খাঁটি উম্মত হওয়ার লক্ষ্যে তাঁর প্রতিটি সুন্নাহ বা আদর্শকে আঁকড়ে ধরি ও আমলে জিন্দেগী গড়ে তুলে আল্লাহর রিজামন্দি হাসিল করি।
কিছু নির্দিষ্ট বিধি-বিধানের আলোকে 'আখেরি চাহার শোম্বা' পালন করা হয়; যদিও ধর্ম-তত্ত্ববিদগণের মধ্যে এই দিবসটি পালন করা নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে।দিবসটি মূলতঃ ‘শুকরিয়া দিবস’ হিসাবে পালিত হয়; যাতে সাধারণতঃ গোসল করে দু’রাকাত শোকরানা-নফল নামাজ আদায় শেষে রোগ থেকে মুক্তির দোয়া ও দান-খয়রাত করা হয়। বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, দরবার, খানকায় ওয়াজ-নসিহত, জিকির-আজকার, মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয় এই দিনটি পালন উপলক্ষে। এদিন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিভাবে বন্ধ রাখার পাশাপাশি অফিস-আদালতে ঐচ্ছিকভাবে ছুটির দিন হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
পৃথিবীর সব মুসলিম যথাযোগ্য ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে এই দিনটি স্মরণ না করলেও বাংলাদেশসহ ভারত উপমহাদেশের মুসলিমরা এই দিন বিশেষভাবে পালন করেন। পারসিক প্রভাবিত এই এলাকার ইসলাম ও মুসলিম সংস্কৃতির অন্যতম বিষয় আখেরি চাহার শোম্বা। কারণ, এ অঞ্চলের সুফিরা এবং দিল্লির শাসকরা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় দিনটি পালন করতেন। ফলে ধীরে ধীরে দিনটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালন করা এই এলাকার মুসলিমদের ধর্মীয় জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
পৃথিবীর সব অঞ্চলের মুসলমানরা যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিনটি পালন না করায় অনেকে এই দিনটি পালনের তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে মোহাম্মদ (সা.)-এর সাময়িক সুস্থতার ঘটনা স্মরণ করে কেউ যদি ইবাদত করে অথবা দান-খয়রাত করেন, তাতে দোষের কিছু নেই। কারণ, দানে-ইবাদতে মানুষ পরিশুদ্ধ হয়। সম্পদ বাড়ে। তাই আখেরি চাহার শোম্বা উপলক্ষে যদি কেউ নফল নামাজ পড়েন, আল্লাহর নামে গরিব-দুঃখীর মাঝে দান-খয়রাত করেন, তাতে ব্যক্তি ও সমাজের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হওয়া ছাড়া অকল্যাণের কিছু আছে বলে মনে হয় না।
নবীজির সুস্থতায় আনন্দিত হয়ে সাহাবীদের অকাতরে দান-সদকা এবং নফল ইবাদতের সুন্নাতটি সে থেকে আজ পর্যন্ত নবীপ্রেমিক সুফিরা জারি রেখেছেন। তাই নবীজির সুস্থতার দিনে দান-খয়রাত এবং নফল ইবাদত এবং শুকরিয়া দিবস হিসেবে উদযাপন করে থাকেন। এ দিনকে মানুষ সুস্থতার ওসিলা হিসেবে বিভিন্ন নফল ইবাদতে কাটায়। মূলত নবী (সা.) সুস্থ হয়েছেন, এটাই যেনো প্রেমিক হৃদয়ে উৎসবের জোয়ার এনে দেয়।
তবে কেউ কেউ বলেন, নবীজির সুস্থতার দিনটি সফর মাসের শেষ বুধবার ছিলো কি না এ নিয়ে মতভেদ আছে। তাই এদিনকে শোকরিয়ার দিন হিসেবে উদযাপন করা যাবে না। এক্ষেত্রে ওলামায়ে হক্কানিরা বলেন, নবীজির সুস্থতার দিনটি সফর মাসের শেষ বুধবার হওয়ার পক্ষে অনেক দলিল রয়েছে। তবে কেউ কেউ বৃহস্পতিবারের কথাও বলেছেন।
তবে হজুর (সা.) যে সাময়িক সুস্থ হয়েছেন এবং সাহাবিরা আনন্দিত হয়ে দান খয়রাত করেছেন এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই।
উল্লেখ্য যে, ২৯ সফর তিনি আবার অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তার মাত্র ১৩ দিন পর ১২ রবিউল আউয়াল ইহকাল ত্যাগ করেন মানবতার মুক্তিদূত হযরত মোহাম্মদ (সঃ) ।
আল্লাহ তাআলা যেন আমাদেরকে সঠিকভাবে পালন করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
লেখক:
প্রভাষক (আরবি)
হযরত শাহজালাল ফাযিল মাদরাসা
ওসমানীনগর, সিলেট
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন