২য় পর্বের পর-
যে কোনো নবীর জন্মের সময় ও তার কিছু আগে এবং পরে অলৌকিক নানা ঘটনা ঘটেছে, যাতে সাধারাণ মানুষ আল্লাহর নবীকে মেনে নেয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।যেমন-
১.আল্লাহর নির্দেশে মায়ের হাতে নবজাতক মুসা নবী (আ.) কে কাঠের বাক্সে চড়িয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেয়া ও ফেরাউনের ঘরেই তাঁর আশ্রয় লাভ। অথচ ফেরাউন মুসা (আ.) এর জন্ম ঠেকানোর জন্য হাজার হাজার শিশু হত্যা করেছিল।
২.পিতা ছাড়া হজরত ঈসা (আ.) এর জন্মগ্রহণ এবং দোলনায় বসে নিজের নবুওত সম্পর্কে বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলার ঘটনা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়।
★★★তবে সকল নবীর চেয়ে এ ধরনের অলৌকিক ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছিল নবী (সা.) এর ক্ষেত্রে এবং এইসব ঘটনা ছিল অনেক বেশি বিস্ময়কর।
নবী (সা.) এর জন্মের প্রাক্কালে ও জন্মের পরে সংঘটিত কিছু অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরা হলো-
১. ইমাম সাদিক্ব (রা.) বলেছেন, শয়তান বা ইবলিস অতীতে সপ্তম আকাশ পর্যন্ত যেতে পারত। অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য সে সপ্তম আকাশ পর্যন্ত যেত। কিন্তু হজরত ঈসা (আ.) এর জন্মের পর থেকে চতুর্থ আকাশের ওপরে ওঠা তার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এরপর যখন নবী (সা.) জন্ম নেন তখন তার জন্য সব আকাশই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। শয়তানকে আকাশের দরজাগুলো থেকে ধূমকেতু দিয়ে বিতাড়ন করা হয়।
২. যে ভোর বেলায় মহানবী (সা.) জন্ম নেন, সেদিন বিশ্বের সবগুলো মূর্তি মাটির দিকে নত হয়ে পড়ে।
৩. সেদিন পারস্যের রাজার বিশাল প্রাসাদের বারান্দা কেঁপে ওঠে এবং ছাদের ১৪টি প্রাচীর ধ্বসে পড়ে।
৪. সেদিন পারস্যের সভে অঞ্চলের হ্রদটি তলিয়ে শুকিয়ে যায়। বহু বছর ধরে এই হ্রদকে পূজা করা হত।
৫. সামাভে অঞ্চলে ( কুফা ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী) পানির প্রবাহ শুরু হয়। অথচ এর আগে বহু বছর ধরে সেখানে কেউ পানি দেখেনি।
৬. পারস্যের শিরাজ শহর সংলগ্ন অগ্নি উপাসনালয়ের আগুন সেই রাতে নিভে যায়। অথচ ওই আগুন এক হাজার বছর পর্যন্ত প্রজ্বলিত ছিল।
৭. সেই রাতে হিজাজ বা বর্তমান সৌদি আরব থেকে একটি আলো দৃশ্যমান হয় এবং তা পূর্বাঞ্চলসহ সারা বিশ্বের ছড়িয়ে পড়ে।
৮. রাসূলের জন্মদিনের রাতে বেলায় হিজাজ বা বর্তমান সৌদি আরব থেকে একটি আলো দৃশ্যমান হয় এবং তা পূর্বাঞ্চলসহ সারা বিশ্বের ছড়িয়ে পড়েছিল।
৯. সেই ভোরে বিশ্বের সব সম্রাটের সিংহাসন উল্টে পড়েছিল।
১০. সেই দিন বিশ্বের সব রাজা বোবা হয়ে পড়েছিলেন। অর্থাৎ তারা কথা বলতে পারছিলেন না।
১১. সেই দিন গণকদের সব জ্ঞান লুপ্ত হয় এবং জাদুকরদের জাদুগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।
১২ ইরানি সম্রাটের প্রাসাদের খিলান আকৃতির তোরণ ভেঙে যায় মাঝখান দিয়ে। ফলে তা দুই টুকরো হয়ে গিয়ছিল।
১৩.নবী (সা:) র মাতা মা আমিনা (রা.) বলেছেন, আল্লাহর কসম, আমার পুত্র জন্ম নিয়েই তাঁর হাতগুলোকে মাটিতে রেখে মাথা আকাশের দিকে তোলে এবং চারদিকে তাকায়। এরপর তার থেকে একটি নূর বা আলো ছড়িয়ে পড়ে ও সে আলোয় সব কিছু দৃশ্যমান হয়। সেই আলোয় সিরিয়ার (রোমানদের) প্রাসাদগুলো দেখলাম এবং সেই আলোর মধ্যে একটি শব্দ শুনলাম, যাতে বলা হয়েছে, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষকে জন্ম দিয়েছ, তাই তাঁর নাম রাখ ‘মুহাম্মাদ’।
১৪.আমিরুল মু’মিনিনি হজরত আলী (রা.) বলেছেন, সে রাতে তথা রাসুলে খোদার (সা.) এর জন্মের রাতে পুরো দুনিয়া আলোকিত হয়। প্রতিটি পাথর ও মাটির টুকরো এবং বৃক্ষ বা গাছ হেসেছে। আর আকাশ ও জমিনের সব কিছু আল্লাহর তাসবিহ বা প্রশংসা জ্ঞাপন করেছে।
১৫.রাসূল সা.এর জন্মের সময় (বড় ও মূল) শয়তান তার সন্তানদের মধ্যে আর্তনাদ করে ওঠে। যার কারণে সবগুলো শয়তান তার কাছে এসে বলে, তুমি কেন এত পেরেশান বা উদ্বিগ্ন হয়েছে? সে বলল, তোমাদের প্রতি আক্ষেপ! রাতের প্রথম থেকে এ পর্যন্ত দেখছি যে আকাশ ও জমিনের অবস্থা বদলে গেছে। ভূপৃষ্ঠে ঘটে গেছে এক বিরাট ঘটনা। ঈসা আ. ঊর্ধ্ব আকাশে চলে যাওয়ার পর আর কখনও এত বড় ঘটনা ঘটেনি। সবাই গিয়ে খোঁজ-খবর নাও, কি ঘটেছে আজ। শয়তানরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো এবং ফিরে এসে বললো, আমরা কিছুই তো দেখলাম না। বড় শয়তান বা শয়তানদের নেতা তখন বললো, এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়া আমারই কাজ।
এরপর সে পবিত্র মক্কার কাবাঘর সংলগ্ন অঞ্চলে এলো। সে দেখল যে ফেরেশতারা কাবাঘরের চারদিক ঘিরে রেখেছেন। শয়তান সেখানে ঢুকতে চাইলে ফেরেশতারা হুংকার দিলেন। ফলে সে ফিরে আসে ও চড়ুই পাখির মতো ছোট হয়ে হেরা পর্বতের দিক থেকে সেখানে প্রবেশ করে। জিবরাইল আ. বললেন, ফিরে যা ওরে অভিশপ্ত! সে বললো, হে জিবরাইল (ফেরেশতা), আমার একটা প্রশ্ন আছে, বলতো আজ রাতে কি ঘটেছে। জিবরাইল আ. বললেন, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মাদ সা. আজ রাতে জন্ম নিয়েছেন। শয়তান আবার প্রশ্ন করলো, তাঁর মধ্যে কি আমার কোনো (কর্তৃত্বের) অংশ আছে? জিবরাইল আ. বললেন, না। শয়তান আবারও প্রশ্ন করলো, তাঁর উম্মতের মধ্যে কি আমার কোনো কর্তৃত্বের অংশ আছে। জিবরাইল আ. বললেন, হ্যাঁ। ইবলিস বলল, আমি সন্তুষ্ট হলাম।
১৬.সুহায়লী বৰ্ণনা করেন যে, ইবলীস জীবনে চারবার বিলাপ করে : ১. অভিশপ্ত হওয়ার সময়। ২. জান্নাত থেকে বিতাড়িত হওয়ার সময়। ৩. রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্মের সময় এবং ৪. সূরা ফাতিহা নাযিল হওয়ার সময়।
১৭.মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, এক ইহুদী মক্কায় বাস করত। সে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করতো। রাসূলুল্লাহ (সা) যে রাতে ভূমিষ্ঠ হন সে রাতে কুরাইশ এর এক মজলিসে সে বলল, আজ রাতে কি তোমাদের মধ্যে কারও কোনও সন্তানের জন্ম হয়েছে? জবাবে তারা বলল, আল্লাহর কসম!! আমরা এ রকম কিছুই জানি না। ইহুদীটি বলল, আল্লাহু আকবার! তোমাদের অজান্তে ঘটে থাকলে তো কোনও অসুবিধা নেই। তবে তোমরা খোজ করে দেখ যা বলছি। স্মরণ রাখা; এ রাতে আখেরী নবী ভূমিষ্ঠ হয়েছেন। তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে একটি চিহ্ন আছে। তাতে ঘোড়ার কেশরের মত একগুচ্ছ চুল আছে। দু রাত তিনি দুধ পান করবেন না। কারণ একটি দুষ্ট জিন তাঁর মুখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়েছে। ফলে তাঁকে দুধ পান থেকে নিবৃত্ত রাখা হয়েছে।
শুনে লোকজন মজলিস ছেড়ে উঠে। চতুর্দিক ছড়িয়ে পড়ে। ইহুদীর কথায় তারা হতভম্ভ স্থম্ভিত! ঘরে গিয়ে প্রত্যেকে তারা ঘরের লোকদেরকে এ খবরটি শুনায়। শুনে তারা বলে উঠে, হ্যাঁ, আল্লাহর শপথ! আব্দুল্লাহ ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের একটি পুত্ৰ সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে। তারা তাঁর নাম রেখেছে মুহাম্মদ। এবার তারা ইহুদীর কথা ও এই নবজাতক সম্পর্কে কানাঘুষা করতে করতে ইহুদীর নিকট যায় এবং তাকে এ খবরটি জানায়। ইহুদীটি বলল, তোমরা আমাকে নিয়ে চল, আমি তাকে একটু দেখব। লোকেরা ইহুদীকে নিয়ে আমেনার ঘরে গিয়ে তাকে বলল, তোমার পুত্রটিকে একটু আমাদের কাছে দাও। আমেনা পুত্ৰকে তাদের কাছে দিলে তারা তাঁর পিঠের কাপড় সরিয়ে ইহুদীর বর্ণিত নিদর্শনটি দেখতে পায়। সাথে সাথে ইহুদী অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার জ্ঞান ফিরলে লোকেরা তাকে বলল, কী ব্যাপার, আপনার হয়েছে কি? ইহুদীটি বলল, আল্লাহর শপথ? নবুওত বনী ইসরাঈল থেকে বিদায় নিল! তোমরা এতে আনন্দিত হও, হে কুরাইশের দল!! আল্লাহর শপথ, তোমাদের সহায়তায় তিনি এমন বিজয় লাভ করবেন যে, প্রাচ্যে-প্রতীচ্যে তীর সুসমাচার ছড়িয়ে পড়বে।
১৮.মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক বৰ্ণনা করেন যে, হাস্সান ইব্ন সাবিত (রা) বলেছেন, আমি তখন সাত কি আট বছরের বালক। যা শুনি বা দেখি, তা বুঝবার বয়স তখন আমার হয়েছে। হঠাৎ একদিন সকাল বেলা ইয়াসরিবে জনৈক ইহুদীকে চীৎকার করে বলতে শুনলাম, হে ইহুদী সমাজ! চীৎকার শুনে লোকজন তার নিকট এসে ভীড় জমায় এবং বলে, বল, কি হয়েছে তোমার? সে বলল আহমদ নামের যে লোকটির জন্ম হওয়ার কথা, এই রাতে তার তারকা উদিত হয়েছে।
১৯.আবু নুআয়ম শুআয়ব এর দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, মারারুদ্য যাহরান নামক স্থানে একজন ধর্মযাজক বাস করতেন। তার নাম ছিল ঈসা। তিনি সিরিয়ার অধিবাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন আস ইব্ন ওয়ায়েল এর আশ্রিত। আল্লাহ তাকে প্রচুর জ্ঞান দান করেছিলেন এবং তাতে মক্কাবাসীদের জন্য বহু উপকার করেছিলেন। তাঁর একটি উপাসনালয় ছিল, তাতেই তিনি সর্বদা থাকতেন। বছরে কেবল একবার মক্কায় আসতেন এবং মক্কাবাসীদের সাথে দেখা সাক্ষাত করতেন। তিনি তাদেরকে বলতেন, হে মক্কাবাসী! অচিরেই তোমাদের মাঝে এমন এক নবজাতকের আবির্ভাব হবে, সমগ্র আরব যার ধর্ম অবলম্বন করবে এবং আজম তথা আরবের বাইরেও তার রাজত্ব ছড়িয়ে পড়বে। এই সেই সময়; যে ব্যক্তি তাঁকে পাবে এবং তাঁর আনুগত্য করবে, সে কৃতকার্য হবে। আর যে ব্যক্তি তাঁকে পেয়েও তীর বিরুদ্ধাচরণ করবে, সে ব্যর্থকাম হবে। আল্লাহর শপথ! তাঁর অনুসন্ধান ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে মদ-রুটি ও শান্তির দেশ ত্যাগ করে আমি এই অভাব-অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতার দেশে আসিনি। মক্কায় কোন সন্তান ভূমিষ্ঠ হলেই তিনি তার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতেন এবং শুনে বলতেন, না, এখন তার আগমন ঘটেনি। তখন তাকে বলা হতো, তাহলে বলুন না, সেই শিশুটি কেমন হবে? তিনি বলতেন, না, বলা যাবে না। প্ৰতীক্ষিত সেই মহান শিশুটির পরিচয় তিনি তাঁর নিরাপত্তার খাতিরেই গোপন রাখতেন। কারণ তিনি জানতেন যে, সেই শিশুটির স্বজাতি তার অনিষ্ট করার চেষ্টা করবে।
রাসূলুল্লাহ (সা) যে রাতে ভূমিষ্ঠ হন। সেদিন প্রত্যুষে আবদুল্লাহ ইব্ন আবদুল মুত্তালিব এসে ঈসের উপাসনালয়ের প্রধান ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে তাকে ডাক দেন। ডাক শুনে তিনি আওয়াজ করে জিজ্ঞেস করেন, কে? তিনি বললেন, আমি আবদুল্লাহ। যাজক তার নিকটে এসে বললেন, তুমি তার পিতা হও। আমি সেই শিশুটির কথা তোমাদের বলতাম যে, তিনি সোমবার দিনে ভূমিষ্ঠ হবেন, সোমবারে নবুওত লাভ করবেন এবং সোমবারেই তার ইন্তিকাল হবে। সেই প্রতীক্ষিত শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়ে গেছেন। আবদুল্লাহ বললেন, আজ প্রত্যুষে আমার একটি সন্তান জন্মেছে। জিজ্ঞাসা করলেন, তার কি নাম রেখেছেন? আব্দুল্লাহ বললেন, নাম রেখেছি, মুহাম্মদ। পদী বললেন, হে কাবার সেবায়েতগণ! আমারও কামনা এই ছিল যে, সেই শিশুটি যেন আপনাদের মধ্য থেকেই আগমন করেন। তিনটি লক্ষণে আমি বুঝতে পেরেছি যে, আপনার পুত্ৰই সেই প্রতীক্ষিত শিশু। এক, গত রাতে তাঁর নক্ষত্র উদিত হয়েছে। দুই, আজ তিনি ভূমিষ্ঠ হয়েছেন এবং তিন, তার নাম মুহাম্মদ। আপনি যান। আমি আপনাদেরকে যে শিশুটির কথা বলতাম, আপনার পুত্র তিনিই। আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি করে বুঝলেন যে, আমার পুত্রই তিনি? আজকে তো অন্য শিশুরও জন্ম হয়ে থাকতে পারে? পাদ্রী বললেন, আপনার পুত্রের সঙ্গে তাঁর নাম মিলে গেছে। আর আল্লাহ আলিমদের জন্য তার ইলমকে সন্দেহজনক করেন না। কারণ, তা হলো অকাট্য প্রমাণ স্বরূপ।
তাছাড়া এর আরও একটি প্রমাণ হলো, আপনার পুত্ৰ এখন ব্যাথাগ্রস্ত। তাঁর এই ব্যথা তিনদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এতে তার ক্ষুধা প্রকাশ পাবে। অতঃপর তিনি সুস্থতা লাভ করবেন। আপনি আপনার জিহবাকে সংযত করে চলবেন। কেননা, তার প্রতি এত বেশি বিদ্বেষ পোষণ করা হবে, যা কখনো অন্য কারও বেলায় হয়নি এবং তার উপর এত বেশি অত্যাচার হবে, যা অন্য কারও উপর কোনদিন হয়নি। তার কথা বলার বয়স পর্যন্ত যদি আপনি বেঁচে থাকেন এবং তিনি তার দাওয়াতের কাজ শুরু করেন, তাহলে আপনার স্বজাতির পক্ষ থেকে আপনি এমন আচরণ দেখতে পাবেন, যা আপনি সহ্য করতে পারবেন না। তখন ধৈর্যধারণ আর লাঞ্ছনা ভোগ করা ব্যতীত কোন গতি থাকবে না। অতএব আপনি আপনার জিহবাকে সংযত রাখবেন এবং তাকে চোখে চোখে রাখবেন। আবদুল্লাহ জিজ্ঞাসা করলেন, শিশুটির আয়ু কত হবে? পাদ্রী বললেন, আয়ু তার বেশি হোক আর কম হোক সত্ত্বরে পৌছবে না। সত্ত্বরের নিচে ষাটের ওপরে যে কোন বেজোড় সংখ্যার বয়সে তাঁর মৃত্যু হবে। আর এই হবে তাঁর উম্মতের অধিকাংশের গড় আয়ু।
বর্ণনাকারী বলেন, মুহাররমের দশ তারিখে রাসূলুল্লাহ (সা) মায়ের গর্ভে আসেন এবং হস্তিবাহিনীর যুদ্ধের তেইশ দিন আগে রমযান মাসের বার তারিখে সোমবার ভূমিষ্ঠ হন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর লালন-পালনকারী ও দাই-ম্যাগণের বিবরণ -
উন্মে আয়মান রাসূলুল্লাহ (সা)-কে লালন-পালন করতেন। তাঁর আসল নাম ছিল বারাকা— এই উম্মে আয়মানকে রাসূলুল্লাহ (সা) উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে নবী করীম (সা) তাঁকে আযাদ করে তাঁর আযাদকৃত গোলাম যায়েদ ইব্নে হারিছার সঙ্গে বিবাহ দেন। এই স্ত্রীর গর্ভেই যায়েদ ইব্নে হারিছার পুত্র উসামা ইব্নে যায়েদ (রা)-এর জন্ম হয়।
হালীমা সাদিয়ার আগে তাঁর মা আমিনা এবং আবু লাহাব-এর দাসী ছুওয়াইবা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দুধপান করাতেন।
২০.ইমাম বুখারী ও মুসলিম তাঁদের সহীহদ্বয়ে বর্ণনা করেন যে, আবু সুফিয়ানের কন্যা উন্মে হাবীবা একদিন রাসূল (সা)-কে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আমার বোন আযযাহ বিনত আবু সুফিয়ানকে বিয়ে করুন! উত্তরে রাসূল (সা) বললেন : এটি কি তুমি পছন্দ করা? আমি বললাম : জী হ্যাঁ। তবে আমিই তো আপনার একমাত্র স্ত্রী নই? কল্যাণ লাভে আমার বোনটি আমার সাথে শরীক হোক এটি আমার পছন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : কিন্তু আমার জন্য হালাল হবে না। উন্মে হাবীবাহ বলেন, তখন আমি বললাম, আমরা কিন্তু বলাবলি করছি যে, আপনি আবু সালামার কন্যাকে বিয়ে করতে আগ্রহী। এক বর্ণনায় আবু সালামার কন্যা দুররার নামও উল্লেখ আছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন : তুমি কি উম্মে সালামার কন্যার কথা বলছ? আমি বললাম, জী হ্যাঁ। তিনি বললেন : উম্মে সালামার কন্যা যদি আমার স্ত্রীর সাথে আগত পালিত কন্যা নাও হত, তবুও সে আমার জন্য হালাল হত না। কারণ সে আমার দুধ ভাই এর কন্যা। ছুওয়াইবা আমি এবং আবু সালামা উভয়কেই দুধ পান করান। অতএব তোমরা আমার কাছে তোমাদের কন্যা ও বোনদের কোন প্রস্তাব নিয়ে এস না। বুখারীর বর্ণনায় এও আছে যে, উরওয়া (র) বলেন, ছুওয়াইবা হচ্ছেন আবু লাহাবের আযাদকৃত দাসী। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে দুধ পান করিয়ে ছিলেন। আবু লাহাব এর মৃত্যুর পর তারই পরিবারের কেউ একজন তাকে অত্যন্ত বিমর্ষ অবস্থায় স্বপ্নে দেখেন। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি এখন কি হালে আছেন? আবু লাহাব বলল, তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর এ পর্যন্ত আমি কোন কল্যাণ চোখে দেখিনি। তবে ছুওয়াইবাকে মুক্ত করে দেয়ার বদৌলতে আমি এই পর্যায়ে উপনীত হয়েছি। এই বলে সে তার বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনীয় মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি ছিদ্রের প্রতি ইংগিত করে।
সুহায়লী প্রমুখ উল্লেখ করেছেন, আবু লাহাবকে যিনি স্বপ্নে দেখেছিলেন, তিনি তারই ভাই আব্বাস (রা)। ঘটনাটি ঘটেছিল আবু লাহাবের মৃত্যুর এক বছর পর, বদর যুদ্ধের পরে। সেই স্বপ্লের বিবরণে একথাও উল্লেখ আছে যে, আবু লাহাব আব্বাসকে বলেছিল যে, সোমবার দিবসে আমার শাস্তি লঘু করা হয়। অভিজ্ঞ মহল বলেন, তার কারণ এই ছিল যে, ছুওয়াইবা যখন আবু লাহাবকে তার ভাতিজা মুহাম্মদ ইব্ন আব্দুল্লাহর জন্যের সুসংবাদ প্ৰদান করে, তক্ষণাৎ সে ছুওয়াইবাকে আযাদ করে দিয়েছিল। এটা তারই পুরস্কার স্বরূপ।
২১.মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক বলেন; অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জন্য হালীমা বিনতে আবী যুওয়াইব-এর দুধপানের ব্যবস্থা করা হয়। হালীমার পিতা আবু যুওয়াইব-এর পুরো নাম আবদুল্লাহ ইব্ন হারিছ। তাঁর বংশলতিকা হচ্ছে এরূপ। আবদুল্লাহ ইব্ন শাজনাহ ইব্ন জাবির ইব্ন রিযাম ইব্ন নাসিরা ইব্ন সাদ ইব্ন বকর ইব্ন হাওয়াযিন। ইব্নে মনসুর ইব্ন ইকরিমা ইব্ন হাফসা ইব্ন কায়স আইলান ইব্ন মুযার। ইব্ন ইসহাক বলেন : আর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দুধ পিতা-তথা হালীমার স্বামীর নাম হারিছ ইব্ন আবদুল উদ্যযা ইব্ন রিফাআ ইব্ন মিলান ইব্ন নাসিরা ইব্ন সাদ ইব্ন বকর ইব্ন হাওয়াযিন। নবী করীম (সা)-এর দুধ ভাই বোনদের নাম যথাক্রমে আবদুল্লাহ ইব্ন হারিছ, আনীস বিনতে হারিছ ও হুযাফা বিনতে হারিছ। হুযাফার অপর নাম শায়মা। ঐতিহাসিকগণ বলেন, এই শায়মাই তার মায়ের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে তাদের বাড়িতে তাঁর অবস্থানকালে লালন-পালন করতেন।
ইব্ন ইসহাক আবদুল্লাহ ইব্ন জাফর ইব্ন আবু তালিব সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি হালিমা বিনতে হারিছ সম্পর্কে শুনেছি যে, তিনি বলেছেন : কোন এক দুর্ভিক্ষের বছর দুগ্ধপোষ্য শিশু সংগ্রহের জন্য বনু সাদের কয়েকজন মহিলার সঙ্গে আমি মক্কায় যাই। (ওয়াকোদী তার সনদে উল্লেখ করেছেন যে, দুগ্ধপোষ্য শিশু অন্বেষণকারী মহিলাদের সংখ্যা ছিল দশ)। দুর্বল একটি গাধীতে সওয়ার হয়ে আমি মক্কায় পৌছি। আমার সঙ্গে ছিল আমারই একটি শিশু সন্তান আর একটি বুড়ো উটনী। আল্লাহর শপথ! উটনীটি আমার এক ফোটা দুধও দিচ্ছিল না। আর শিশুটির যন্ত্রণায় আমরা সেই রাতে একবিন্দুও ঘুমাতে পারিনি। কারণ তাকে খাওয়াবার মত না পেয়েছি আমার স্তনে এক ফোটা দুধ, না পেয়েছি তাকে পান করাবার মত উটনীর সামান্য দুধ। তবে আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠে স্বচ্ছলতা লাভে আশাবাদী ছিলাম। যা হোক, আমি ছাড়া আমার সঙ্গী সব মহিলা একটি করে শিশু নিয়ে নেয়। আমরা যখন মুহাম্মদ ছাড়া আর কোন শিশুই পেলাম না এবং ফেরার জন্য প্রস্তুতি গ্ৰহণ করলাম; তখন আমার স্বামী হারিছকে বললাম, আল্লাহর শপথ, শিশু সন্তান না নিয়ে এইভাবে শূন্য হাতে ফিরে যেতে আমার খারাপ লাগছে। আমি ওই এতীম শিশুটিকে অবশ্যই নিয়ে যাব। স্বামী বললেন, ঠিক আছে, তাই কর! হতে পারে, আল্লাহ তার মধ্যে আমাদের জন্য বরকত রেখেছেন। আমি গিয়ে শিশুটিকে নিয়ে নিলাম। আল্লাহর শপথ, আমি তো তাকে গ্রহণ করেছিলাম অন্য শিশু না পেয়ে নিতান্ত নিরূপায় হয়ে। এতীম মুহাম্মদকে নিয়ে আমি আমার বাহনের কাছে গেলাম। আমি লক্ষ্য করলাম, আমার স্তনদ্বয় পর্যাপ্ত দুধে পরিপূর্ণ। শিশু মুহাম্মদ তৃপ্তির সাথে তা পান করে এবং তার দুধ ভাইও সেই দুধ পান করে তৃপ্ত হয়। আমার স্বামী উটনীর নিকট গেলেন। তিনি দেখতে পান যে, তার স্তন দুধে পরিপূর্ণ। উটনী থেকে তিনি দুধ দোহন করলেন। নিজে পান করলেন, আমিও তৃপ্তি সহকারে পান করলাম। আমরা শান্তিতে রাত কাটালাম।
সকালে ঘুম থেকে উঠে আমার স্বামী আমাকে বললেন, হালীমা! আল্লাহর শপথ, আমার মনে হচ্ছে, তুমি একটি বরকতময় শিশুই নিয়েছ। দেখলে না, ওকে আনার পর থেকে এই রাতে আমরা কত কল্যাণ ও বরকত লাভ করলাম! এরপর থেকে আল্লাহ আমাদের জন্য এই কল্যাণ আরও বৃদ্ধি করতে থাকেন।
এরপর আমরা সকলে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। শপথ আল্লাহর! আমার গাঁধাটি আমাদের নিয়ে এত দ্রুতগতিতে ছুটে চলে যে, সঙ্গের একটি গাধাও তার নাগাল পাচ্ছিল না। তা দেখে আমার সঙ্গীরা বলতে শুরু করে যে, আবু যুআইব-এর কন্যা! ব্যাপারটা কী? এই কি তোমার সেই গাঁধা, যাতে করে তুমি আমাদের সঙ্গে এসেছিলে? আমি বললাম, হ্যাঁ, এটিই আমার সেই গাঁধা, যাতে চড়ে আমি তোমাদের সঙ্গে এসেছিলাম। তারা বলল, আল্লাহর শপথ! নিশ্চয় এর বিশেষ কোন রহস্য আছে!
এভাবে আমরা বনু সাদ-এর এলাকায় এসে পৌঁছলাম। তখন এই ভূখণ্ড অপেক্ষা আল্লাহর জমীনে অধিকতর অনুর্বর কোন ভূমি ছিল বলে আমার মনে হয় না। আমার বকরীর পাল সারাদিন চরে সন্ধ্যাবেলা তৃপ্ত পেটে স্তন ভর্তি দুধ নিয়ে ফিরে আসতে শুরু করে। আমরা ইচ্ছামত দুধ দোহন করতে লাগলাম। অথচ, আমাদের আশেপাশে তখন কারও বকরীই এক ফোটা দুধ দিচ্ছিল না। প্রতিবেশীর বকরীগুলো সারাদিন চরে সন্ধ্যাবেলা ক্ষুধার্তা পেটেই ফিরে আসতো। তারা তাদের রাখালদের বলে দেয় যে, আবু যুআইব-এর কন্যার বকরী পাল যেখানে চরে, আজ থেকে আমাদের বকরীগুলোও তোমরা সেখানেই চরাবে। ফলে, তারা তাদের বকরী আমার বকরী পালের সঙ্গে চরাতে শুরু করে। কিন্তু তার পরও তাদের বকরী সেই দুধাবিহীন ক্ষুধার্ত অবস্থায় ফিরতো আর আমার বকর ফিরতো তৃপ্তপেটে স্তন ভর্তি দুধ নিয়েই। এইভাবে দুদুটি বছর পর্যন্ত আল্লাহ আমাদেরকে বরকত দান করতে থাকেন।
দুর্ভিক্ষের কারণে তখনকার পারিপার্শ্বিক অবস্থা এই ছিল যে, পরিণত বয়সের একটি যুবককে একটি কিশোরের সঙ্গে তুলনা করা মুশকিল ছিল। কিন্তু আল্লাহর শপথ, দুটি বছর অতিক্রান্ত হতে না হতে মুহাম্মদ একটি পরিপূর্ণ বালকে পরিণত হন। আমরা তাকে তার মায়ের নিকট নিয়ে গেলাম। অথচ, তার বরকত থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকায় তাকে ফিরিয়ে দিতে আমাদের মন সরছিল না। যা হোক, তার মা তাকে দেখার পর আমি বললাম, আরও একটি বছরের জন্য আপনার পুত্ৰকে আমার নিকট দিয়ে দিন। আমি মক্কার মহামারীতে ছেলেটির আক্রান্ত হয়ে পড়ার আশংকা করছি। আল্লাহর শপথ, আমি কথাটা বারবার বলায় শেষ পর্যন্ত তিনি সম্মত হয়ে বললেন, ঠিক আছে নিয়ে যাও!
তাকে সঙ্গে করে আমরা বাড়ি চলে গেলাম। দুই কি তিন মাস কেটে গেল। একদিন তিনি তাঁর দুধ-শরীক এক ভাইয়ের সঙ্গে আমাদের বাড়ির পেছনে বকর চরাতে যান। হঠাৎ তাঁর ভাইটি দৌড়ে এসে বলল, আমাদের ঐ কুরাইশী ভাইকে সাদা পোশাক পরা দুজন লোক এসে তাকে শুইয়ে তার পেট চিরে ফেলেছে! খবর শুনে আমি ও তাঁর দুধ পিতা দৌড়ে তার নিকট গিয়ে দেখতে পেলাম, বিবর্ণ অবস্থায় তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর দুধ পিতা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করেন, বাবা! তোমার কী হয়েছে? জবাবে তিনি বললেন, সাদা পোশাক পরা দুজন লোক এসে আমাকে শুইয়ে ফেলে এবং আমার পেট চিরে পেটের ভেতর থেকে কী যেন বের করে ফেলে দিল! তারপর আমার পেট আগে যেমন ছিল তেমনি করে দেয়। হালীমা বলেন, আমরা তাকে ঘরে নিয়ে গেলাম। তাঁর দুধ পিতা বললেন, হালীমা! আশংকা হয় যে, আমার এই সন্তানটিকে জিনে পেয়ে বসেছে। চল, আমরা যা আশঙ্কা করছি, কিছু একটা ঘটে যাওয়ার আগেই ভালোয় ভালোয় আমরা তাকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আসি। তাকে নিয়ে আমরা তার মায়ের কাছে চলে গেলাম। দেখে তার মা জিজ্ঞাসা করলেন, ব্যাপার কী, হে স্নেহশীলা ধাত্রী? আমার পুত্রের প্রতি তোমাদের দুজনের এত আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তোমরা একে ফিরিয়ে আনলে কেন? হালীমা ও তাঁর স্বামী বললেন, আল্লাহর শপথ!! আল্লাহর অনুগ্রহে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করেছি। এখন এর ব্যাপারে আমাদের মনে নানা আপদ-বিপদের আশংকা হচ্ছে। তাই আপনার পুত্ৰকে আপনার নিকট ফিরিয়ে দিতে আসলাম।
তখন তিনি বলেন, তোমরা কিসের আশংকা করছ? কী ঘটেছে সত্যি করে আমাকে খুলে বল! আমরা তাকে ঘটনার বৃত্তান্ত শোনালাম। শুনে তিনি বললেন, তোমরা কি এর ব্যাপারে দুষ্ট জিনের ভয় করছ? কখনো নয়, আল্লাহর শপথ! আমার এই পুত্রের উপর শয়তানের কোন হাত থাকতে পারে না। আল্লাহর শপথ! আমরা এই পুত্র ভবিষ্যতে বিরাট কিছু হবে। আমি কি তোমাদেরকে এর ঘটনা শোনোব? আমার বললাম, জী হ্যাঁ, শোনান। তিনি বললেন, ও যখন আমার গর্ভে, তখন একদিন আমি স্বপ্নে দেখলাম, যেন আমার ভেতর থেকে এক ঝলক আলো বের হয়ে তাতে সিরিয়ার সকল রাজপ্ৰাসাদ আলোকিত হয়ে গেছে। আবার আমি যখন তাকে প্রসব করি, তখন সে আকাশ পানে মাথা তুলে দুহাতে ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে ভূমিষ্ঠ হয়। সুতরাং তোমরা এ নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না! এ বর্ণনাটি আরও একাধিক সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। সীরাত ও মাগায়ী বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে এটি একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা।
ওয়াকিদী… ইব্ন আব্বাসের বরাতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, হালীমা একদিন নবী করীম (সা)-এর সন্ধানে বের হন। খুঁজে খুঁজে একস্থানে তাকে তার বোনের সঙ্গে পান। তখন তাদের পালের পশুগুলো শুয়ে রয়েছিল। দেখে হালীমা বললেন, তোমরা এই গরমের মধ্যে বসে আছ? জবাবে শিশু নবীর বোন বললেন, আম্মা! আমার এ ভাইটির তো গরম পাচ্ছে না। দেখলাম, একখণ্ড মেঘ ওকে ছায়া দিচ্ছে। ও থামলে মেঘও থেমে যায়, ও চললে মেঘও ওর সাথে সাথে চলতে শুরু করে। এই অবস্থায়ই আমরা এই জায়গায় এসে পৌছেছি।
২২.ইব্ন ইসহাক খালিদ ইব্ন মদান সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, কয়েকজন সাহাবী একদিন রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বললেন, আমাদেরকে আপনার নিজের সম্পর্কে কিছু বলুন। নবী করীম (সা) বললেন, হ্যাঁ, বলছি; আমি আমার পিতা ইবরাহীমের দোয়া ও ঈসার সুসংবাদ। আর আমি গর্ভে থাকাবস্থায় আমার আম্মা স্বপ্নে দেখেন, তার ভেতর থেকে এক ঝলক নূর বেরিয়ে আসে, যার আলোকে সিরিয়ার রাজপ্রাসাদসমূহ আলোকিত হয়ে উঠে। সাদ ইব্ন বকর গোত্রে আমি ললিত-পালিত হই। একদিন আমি আমাদের ছাগল-ভেড়া চারাচ্ছিলাম। এমন সময় সাদা পোশাক পরিহিত দুজন লোক আমার নিকট আসে। সঙ্গে তাদের বরফ ভর্তি একটি সোনার তশতরী। আমাকে তারা শুইয়ে ফেলে, আমার পেট চিরে ফেলে তারপর হৃৎপিণ্ড বের করে তা চিরে ভিতর থেকে কালো রংয়ের একটি রক্তপিণ্ড বের করে ফেলে দেয়। তারপর সাথে আনা বরফ দ্বারা আমার হৃৎপিণ্ড ও পেট ধুয়ে দিয়ে আমাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে। তারপর তাদের একজন অপরজনকে বলে, একে তার দশজন উম্মতের সঙ্গে ওজন কর। অপরজন আমাকে আমার দশজন উম্মতের সঙ্গে ওজন করে। আমার পাল্লা ভারী হয়। তারপর বলে, এবার তাকে তার একশ উম্মতের সঙ্গে ওজন কর! সে আমাকে একশ জনের সঙ্গে ওজন করে। এবারও আমার পাল্লা ভারী হয়। আবার বলে, এবার তাকে তার উম্মতের এক হাজার জনের সঙ্গে ওজন কর। আমাকে এক হাজার জনের সঙ্গে ওজন করে। এবারও আমার পাল্লা ভারী হয়। এইবার লোকটি বলে, হয়েছে, আর প্রয়োজন নেই। একে তার সমস্ত উম্মতের সঙ্গেও যদি ওজন করা হয়, তবু তার পাল্লাই ভারী হবে। এ সনদটি উত্তম।
২৩.আবু নুআয়ম তাঁর দালায়িল গ্রন্থে বর্ণনা করেন যে, উতবা ইব্ন আবদুল্লাহ বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা)-কে জিজ্ঞাসা করে, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনার প্রথম জীবনের অবস্থা কেমন ছিল? জবাবে নবী করীম (সা) বললেন, যে মহিলা আমাকে দুধ পান করাতেন, তিনি ছিলেন বনু সাদ গোত্রীয়। একদিন আমি আর তার এক পুত্র ভেড়া-বকরী চরানোর জন্য মাঠে যাই। যাওয়ার সময় সঙ্গে করে খাবার কিছু নিয়ে যাইনি। তাই আমি আমার দুধ ভাইকে বললাম, তুমি গিয়ে আম্মার নিকট থেকে খাবার নিয়ে এস। আমার ভাই চলে গেল। আর আমি পশুপালের নিকট রয়ে গেলাম। হঠাৎ দেখি, শকুনের মত দুটি সাদা রংয়ের পাখি আমার দিকে ধেয়ে আসছে। এসে একটি অপরটিকে বলে, এই কি সেই লোক? অপরটি বলল, হ্যাঁ। তারপর তারা দ্রুত আমার একেবারে নিকটে এসে আমাকে চিৎ করে শুইয়ে আমার পেট চিরে ফেলে। তারপর আমার হৃৎপিণ্ড বের করে তার মধ্য থেকে দুটি কালো রক্তপিণ্ড বের করে। তারপর বরফের পানি দিয়ে আমার পেট ধুয়ে নেয়। তারপর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে আমার হৃদপিণ্ড ধোয়। তারপর আমার হৃদয়ে প্রশান্তি ঢেলে দেয়। তারপর একজন অপরজনকে বলে, এবার সেলাই করে দাও। পেট সেলাই করে আমার ওপর নবুওতের মোহর অংকিত করে দেয়। তারপর একজন অপরজনকে বলে, একে দাড়ির এক পাল্লায় রেখে আর তার উন্মতের এক হাজার জনকে অপর পাল্লায় রেখে ওজন কর। সে মতে আমাকে ওজন করা হল। আমি দেখলাম, এক হাজার জনের পাল্লা উপরে ওঠে গেল। আমার ভয় হচ্ছিল, তাদের কেউ আমার পর হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিনা। তখন একজন বলল, যদি এর সকল উম্মতের সঙ্গেও একে ওজন করা হয়, তবু এর পাল্লা ভারী হবে।
তারপর তারা আমাকে ফেলে চলে যায়। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। তারপর মায়ের নিকট গিয়ে ঘটনা খুলে বললাম। শুনে তিনিও শংকিত হয়ে পড়েন: পাছে আমার কোন ক্ষতি হয়ে যায়। তাই তিনি বললেন, তোমার জন্য আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। সঙ্গে সঙ্গে তিনি উটের পিঠে করে আমাকে আমার আম্মার নিকট নিয়ে গেলেন। বললেন, আমি আমার আমানত বুঝিয়ে দিলাম ও দায়িত্ব পালন করলাম। এই বলে তিনি আমার সব ঘটনা খুলে বললেন। কিন্তু সব শুনেও আমার আম্মা বিন্দুমাত্র বিচলিত হলেন না। তিনি বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমার ভেতর থেকে এক ঝলক নূর বের হয়, যার আলোকে সিরিয়ার রাজ-প্ৰাসাদগুলো আলোকিত হয়ে যায়। এই বর্ণনায় এমন একজন রাবী রয়েছেন যার জাল হাদীস রটনার দুর্নােম রয়েছে-যদরুন হাফিজ ইব্ন আসাকির বর্ণনা করেন যে, আবুযর গিফারী (রা) বলেছেন, একদিন আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি কি করে জানলেন এবং কিভাবে নিশ্চিত হলেন যে, আপনি নবী? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, শোন হে আবু যর! আমি মক্কার উপকণ্ঠে অবস্থান করছিলাম। এই সময়ে দুজন ফেরেশতা আমার নিকট আগমন করেন। একজন মাটিতে অবতরণ করেন। আর অপরজন আকাশ ও জমিনের মধ্যখানে অবস্থান করেন। এক পর্যায়ে তাদের একজন অপরজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইনিই কি সেই লোক? অপরজন বললেন হ্যাঁ, ইনিই সেই লোক। তখন প্ৰথমজন বললেন : একে একজন মানুষের সঙ্গে ওজন কর। ফেরেশতা আমাকে একজন মানুষের সঙ্গে ওজন করে। ওজনে আমার পাল্লা ভারী হয়।
ইব্ন আসাকির সম্পূর্ণ হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। এতে তিনি নবী করীম (সা)-এর বক্ষবিদারণ, বক্ষ সেলাই ও দুই কাঁধের মাঝে মোহরে নবুওত স্থাপনের কথাও উল্লেখ করেছেন। এ বর্ণনায় অতিরিক্ত আছে- এরপর তারা চলে যান। আমি যেন এখনো তা দিব্যি দেখতে পাচ্ছি।
২৪.সহীহ মুসলিমে আনাস ইব্ন মালিক (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন, একদিন শিশু নবীর নিকট জিবরাল (আঃ) আগমন করেন। নবী করীম (সা) তখন অন্য বালকদের সাথে খেলা করছিলেন। জিবরাল (আ) শিশু নবীকে ধরে মাটিতে শুইয়ে তাঁর পেট চিরে তাঁর হৃদপিণ্ড বের করে আনেন। তারপর হৃৎপিণ্ড থেকে একটি কালো রক্তপিণ্ড বের করেন এবং বলেন, এটি শয়তানের অংশ। তারপর সোনার একটি পাত্রে যমযমের পানি দ্বারা হৃদপিণ্ডটি ধুয়ে নেন। অতঃপর তা যথাস্থানে স্থাপন করে দেন।
ঘটনা দেখে বালকরা দৌড়ে নবীজির দুধ-মায়ের নিকট এসে বলে, মুহাম্মদকে খুন করা হয়েছে। শুনে সকলে তাঁর নিকট দৌড়ে আসে। তখন তার মুখমণ্ডল ফ্যাকাশে। আনাস (রা:) বলেন, আমি তার বুকে সেই সেলাইয়ের দাগ দেখতে পেতাম।
ইব্ন আসাকির আনাস (রা) সূত্রে আরও বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, নামায মদীনায় ফরয হয়। দুইজন ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট এসে তাকে যমযমের কাছে নিয়ে যান। তারপর তার পেট চিরে নাড়িজুড়ি বের করে একটি সোনার পেয়ালায় নিয়ে যমযমের পানি দ্বারা তা ধুয়ে দেন। তারপর তার উদরকে প্রজ্ঞা ও ইলম দ্বারা ভরে দেন।
অন্য সূত্রে আনাস (রা) থেকে আরও বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, পরপর তিন রাত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট কয়েকজন ফেরেশতা আগমন করেন। তাদের একজন অন্যদেরকে বলেন, মানুষের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি এবং তাদের নেতাকে নিয়ে চল। ফেরেশতারা তাকে যমযমের নিকট নিয়ে যান এবং তার পেট বিদীর্ণ করেন। তারপর একটি সোনার পাত্র এনে শিশু নবীর পেটকে ধুয়ে তা প্রজ্ঞাও ঈমান দ্বারা ভরে দেন।
উল্লেখ্য যে, সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত মিরাজের হাদীসেও উক্ত রাতে নবীজির বক্ষবিদারণ এবং যমযমের পানি দ্বারা তা ধৌত করার ঘটনা উল্লেখিত হয়েছে। তবে এতে কোনও বৈপরীত্য নেই। কারণ, হতে পারে একই ঘটনা নবী করীম (সা)-এর জীবনে দুবার ঘটেছে। একবার তাঁর শৈশবে আর একবার মিরাজের রাতে, তাকে উধৰ্ব্বজগতে আরোহণ এবং আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার উপযোগীর জন্য প্রস্তুতি করার লক্ষ্যে।
ইব্ন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সাহাবীগণকে বলতেন, আমি তোমাদের শ্রেষ্ঠ আরবী, আমি কুরাইশী এবং দুধপান করেছি। আমি সাদ ইব্ন বকর গোত্রে।
২৫.ইব্ন ইসহাক আরো বলেন, দুধ ছাড়ানোর পর হালীমা শিশু নবীকে তার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দিতে যাওয়ার পথে একদিন তিনি নবীজিকে নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথে নাসারাদের একটি কাফেলার সঙ্গে তাদের সাক্ষাত হয়। দেখে কাফেলার লোকেরা শিশু নবীর দিকে এগিয়ে এসে তাকে চুমো খায় এবং বলে, এই বালকটিকে অবশ্যই আমরা আমাদের রাজার নিকট নিয়ে যাব। কারণ, ছেলেটি ভবিষ্যতে বিরাট কিছু হবে। হালীমা বড় কষ্টে পুত্ৰকে তাদের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনেন। ইব্ন ইসহাক বলেন, উক্ত কাফেলার হাত থেকে মুক্ত করে তাঁকে নিয়ে যখন হালীমা মক্কার নিকটে চলে আসেন, তখন হঠাৎ শিশু নবী (সা) হারিয়ে যান। অনেক খোঁজাখুঁজি করে হালীমা আর তাকে পেলেন না। সংবাদ পেয়ে দাদা আবদুল মুত্তালিব নিজে এবং আরও একদল লোক তাঁর সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। খুঁজতে খুঁজতে ওয়ারাকা। ইব্ন নওফল ও অপর এক ব্যক্তি তাঁর সন্ধান পান। পেয়ে তাঁকে তারা দাদা আবদুল মুত্তালিবের নিকট নিয়ে যান। আবদুল মুত্তালিব শিশু নবীজিকে কাঁধে তুলে নিয়ে বায়তুল্লাহয় চলে যান এবং তাওয়াফে শিশু নবীজির নিরাপত্তার জন্য দোয়া করেন। অতঃপর তাকে তাঁর মায়ের নিকট ফিরিয়ে দেন।
চলবে-----+
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন