মুফতি ও ফতোয়া প্রার্থীর করনীয়
মুফতি ও ফতোয়া প্রার্থীর করনীয়
লেখক: মুফতী মুহাম্মদ আল-আমিন হানাফি
প্রভাষক (আরবি),হযরত শাহজালাল ফাযিল মাদরাসা
ওসমানীনগর, সিলেট।
★ফতোয়া প্রদানের যোগ্যতা:-
যিনি ফতোয়া প্রদান করেন বা ফতোয়া প্রদানের কাজে নিয়োজিত থাকেন, তাঁকে মুফতী বলা হয়। মুফতী হওয়ার জন্য অনেকগুলো শর্ত রয়েছে। ফিকাহ বিশারদগণ এসব শর্ত তাদের কিতাবাদিতে নির্ধারণ করেছেন। সেখান থেকে শর্তগুলো নিম্নে প্রদত্ত হলো-
১. মুফতীকে মুসলিম হতে হবে। অমুসলিমের ফতোয়া প্রদান বৈধ নয়।
২. তার (আকল) বিবেক-বুদ্ধি থাকতে হবে। পাগল বা মাতালের ফতোয়া প্রদান বৈধ নয়।
৩. বালেগ হতে হবে। না-বালেগের ফতোয়া গ্রহনযোগ্য নয়।
৪. মুফতীকে ন্যায়পরায়ণ, সুবিচারক এবং পুণ্যবান হতে হবে। ফাসেক পাপাচারীর ফতোয়া প্রদান বৈধ নয়।
৫. ফতোয়া প্রদানকারীকে খুব সচেতন ও বিচক্ষণ হতে হবে। মানুষের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। কেননা কিছু লোক এমন আছে, যারা প্রতারণা ও ধোঁকার মাধ্যমে কথা পাল্টিয়ে দেয়াসহ ভ্রান্ত একটি বিষয়কে সত্য ও সঠিকের আবরণে উপস্থাপন করার যথেষ্ট যোগ্যতা রাখে। ফলে এ ক্ষেত্রে একজন মুফতীর অমনোযোগিতা ও অসচেতনতা বিরাট বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে। মুফতীর জন্য অবশ্যকর্তব্য হলো, মানুষের ধোঁকা, প্রতারণা এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হওয়া। তা না হলে তিনি যেমন নিজে পথভ্রষ্ট হবেন তেমনি অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবেন। একজন মুফতী যদি মানুষের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত না হন, তাহলে তার নিকট জালিম মজলুমের কিংবা মজলুম জালিমের আকৃতিতে প্রকাশ পেতে পারে।
৬. মুফতীর এমন যোগ্যতা থাকতে হবে যাতে তিনি অতীত ও বর্তমান লিখিত দ্বীনি কিতাবসমূহ বুঝতে পারেন এবং এর থেকে যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে ফতোয়াপ্রদানে সক্ষম হন।
৭. মুফতীর জন্য আরেকটি শর্ত হলো, তাকে কোনো অভিজ্ঞ মুফতীর কাছ থেকে অনুমতিপ্রাপ্ত হতে হবে।
৮. তার বিশুদ্ধ নিয়ত থাকতে হবে। যদি নিয়াত ঠিক না হয় তাহলে সেখানে নূর আসে না।
৯. তার ইলম, সহিষ্ণুতা, গাম্ভীর্য ও স্থিরতা থাকতে হবে।
১০. ইলমের মধ্যে গভীরতা ও শক্ত ভিত্তি থাকতে হবে।
১১. তার যথেষ্ট যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকতে হবে, যাতে তিনি অন্যের সাহায্য ছাড়াই সমাধান দিতে পারেন।
১২. মানুষের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত থাকতে হবে।
ফতোয়া প্রদানের আদবসমূহ
১৩. যিনি মুফতী হবেন তাঁর উচিত হবে শরীয়তের বিধানসমূহের প্রতি লক্ষ রেখে পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করা। তা সুন্দর রাখা এবং পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার উপর গুরুত্ব দেয়া। রেশমী কাপড়, স্বর্ণ এবং যেসকল পোশাকে অমুসলিমদের নিদর্শন রয়েছে তা পরিত্যাগ করা। যদি তিনি উন্নতমানের কাপড়-চোপর পরতে চান তাতে দোষের কিছু নেই।
১৪. তাঁর উচিত কথাবার্তা এবং কাজকর্মে উন্নত মানসিকতার অধিকারী হওয়া। কেননা তিনি হলেন মানুষের জন্য একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। সুতরাং বক্তব্যের মতো তার কথা-বার্তায়ও গাম্ভীর্য থাকতে হবে। কেননা তার কথা-বার্তার বিশেষ গুরুত্ব থাকে।
১৫. তাঁর উচিত হবে চিন্তা-ভাবনাকে পরিশুদ্ধ করে নেয়া। বিশুদ্ধ নিয়তের সাথে ফতোয়া প্রদান করা। কেননা তাঁকে মনে রাখতে হবে তিনি রাসূল সা.-এর প্রতিনিধি হিসেবে আল্লাহর বিধান বর্ণনা করছেন।
১৬. তিনি যা ফতোয়া দিচ্ছেন তদনুযায়ী তাকে আমল করতে হবে। অর্থাৎ তিনি যে সকল কল্যাণমূলক কাজের ফতোয়া দেন তাঁকে সে অনুযায়ী চলতে হবে এবং যা কিছু থেকে মানুষকে বিরত থাকতে বলেন সর্বাগ্রে তাকেই সেসব কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। তা হলেই কেবল তাঁর কথা এবং কাজের মধ্যে সামঞ্জস্যতা পাওয়া যাবে। আর যদি তা না হয়, তাহলে তার আমল তার বক্তব্যকে অস্বীকার করবে। ফলে মানুষ তার বক্তব্যে নয় বরং কাজের দ্বারাই প্রভাবিত হবে।
১৭. অত্যধিক রাগ, আনন্দ, পিপাসা, ক্ষুধা, অসুস্থতা, অসহ্যগরম, প্রচণ্ড শীত প্রভৃতি অবস্থাসমূহে ফতোয়া প্রদানে বিরত থাকা একান্ত কর্তব্য। কেননা উপরোক্ত অবস্থাসমূহ সঠিক চিন্তা-ভাবনা ও বিশুদ্ধ বক্তব্য প্রদানে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
১৮. যদি তাঁর আশেপাশে বিজ্ঞ আলেমে দ্বীন থাকেন যার উপর পূর্ণ আস্থা রাখা যায়, তা হলে তার সাথে পরামর্শ করে ফতোয়া দেয়া উচিত। নিজেকে বড় মনে করে অন্যের সাথে পরামর্শ না করা ঠিক হবে না।
১৯. ফতোয়াপ্রার্থীর অবস্থার প্রতি লক্ষ রাখতে হবে। অনেক ফতোয়াপ্রার্থীর জ্ঞান কম হয়ে থাকে। ধৈর্যের সাথে তার প্রশ্ন শুনে তাকে এর উত্তর বুঝিয়ে দিতে হবে।
২০. যখন লিখিত আকারে মুফতীর কাছে কোন ফতোয়া চাওয়া হয়, তখন প্রশ্নটি ধীরস্থিরভাবে পড়ে লক্ষ্য করে দেখবেন যে, প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার যোগ্য কিনা কিংবা এর উত্তর দেওয়া হলে কোন ভুল বুঝাবুঝি বা কোন অবান্তর ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টির আশংকা আছে কিনা? যদি প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া অযোগ্য বলে বিবেচিত হয় অথবা এর উত্তর দেওয়া হয়ে ভুল বুঝাবুঝি বা ফিতনা ফ্যাসাদ সৃষ্টির ভয় থাকে, তবে এর উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। আর যদি প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার যোগ্য হয় তবে প্রশ্নের সাথে সমতা রক্ষা করে যথাযথভাবে ফতোয়া প্রদান করবেন।
২১. যদি এমন বিষয়ে ফতোয়া চাওয়া হয় যা সংঘটিত হয়নি, তা হলে তার উত্তর দেয়ার প্রয়োজন নেই। যাতে ফতোয়াপ্রার্থী এ কথা বুঝে নিতে পারে যে, অযথা ফতোয়া চাওয়া সঠিক নয়।
★ফতোয়াপ্রার্থীর করণীয়:-
১. কোনো মুসলিম যখন কোনো দ্বীনি সমস্যার সম্মুখীন হন তখন তার উচিত হবে কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতীর শরণাপন্ন হওয়া। যদি তার নিজ শহরে নির্ভরযোগ্য মুফতী পাওয়া না যায়, তাহলে অন্য কোনো শহরে তালাশ করতে হবে।
২. ফতোয়াপ্রার্থীর উচিত হবে ফতোয়া প্রদানকারীর সাথে আদব রক্ষা করা, তাকে সম্মান করা, তার জ্ঞানের মর্যাদা দেয়া। কেননা তিনি তাকে রাস্তা দেখাচ্ছেন।
৩. ক্রোধ, অসন্তোষ, পেরেশানি ইত্যাদির সময় ফতোয়া না চাওয়া।
৪. অধিক প্রশ্ন না করা। যা সংঘটিত হয়নি সে সম্পর্কে প্রশ্ন না করা। দ্বীনি কোনো উপকার নেই, এমন কোনো বিষয়ে ফতোয়া না চাওয়া। ইবাদত বন্দেগির কাঠিন্য এবং কৌশল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা না করা। একগুয়েমি বা জিদের বশবর্তী হয়ে অথবা ঝগড়া-বিবাদে জয়ী হবার মানসে প্রশ্ন না করা।
৫. লিখিতভাবে ফতোয়া চাইতে হবে। প্রার্থী লিখতে না জানলে অন্যের মাধ্যমে লিখিয়ে নিতে হবে।
৬. বড় সাইজের কাগজে সুন্দর ও স্পষ্ট অক্ষরে প্রশ্ন লিখতে হবে। যেন ফতোয়া একই কাগজেই উপস্থাপন করা যায়।
★ফতোয়া লিখার নিয়মাবলি
১. বিসল্লিাহির রাহমানির রাহীম এবং হামদ ও সানা দিয়ে ফতোয়া লিখা শুরু করা উচিত।
২. ফতোয়া প্রদানকারীর উচিত, সুন্দর ও স্পষ্টভাবে ফতোয়া লিপিবদ্ধ করা। এতে ফতোয়ার ভাষা ও উদ্দেশ্য বুঝতে সহজ হবে এবং অস্পষ্টতা ও জটিলতামুক্ত থাকবে। প্রয়োজনে কাগজের দুই পাশে পার্শ্বটীকা লেখার জন্য খালি রাখতে হবে।
৩. ফতোয়া প্রদানকারীর উচিত, প্রশ্নের কাগজেই জবাব লিপিবদ্ধ করা। যতোটুকু সম্ভব ভিন্ন কাগজ ব্যবহার না করা। তা না হলে অন্য কোনো প্রশ্ন ঢুকিয়ে দেয়ার সম্ভাবনা থেকে যাবে।
৪.ফতোয়া এমনভাবে স্পষ্টভাষায় লিখতে হবে যেন অন্য কিছু বুঝার সুযোগ না থাকে। সারসংক্ষেপ ভাষায় ফতোয়া লেখা উচিত নয়। এতে ফতোয়াপ্রার্থী দিশেহারা হতে পারে।
৫.সংক্ষিপ্তাকারে ফতোয়ার জবাব লিপিবদ্ধ করা উচিত। বিনা প্রয়োজনে বিস্তারিত বর্ণনা পরিহার করা দরকার। কেননা ফতোয়া হলো নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তরপ্রদান। এটা কোনো ওয়াজ-তালীম বা রচনা নয়।
৬.যদি কোনো ফিকহী মাসআলার উত্তর লিখা হয় তাহলে তার শেষে والله اعلمআর যদি আকায়িদের কোনো প্রশ্নের উত্তর লিখা হয় তবেوالله الموفق লেখা উচিত।
৭.সবশেষে যেদিন ফতোয়া চূড়ান্তভাবে লিখার কাজ সমাপ্ত হয় সেদিন মুফতী সাহেব তার দস্তখত, সম্ভব হলে প্রতিষ্ঠানের সিলমোহরসহ সেদিনটির তারিখও লিখে দিবেন।
ফতোয়া ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। আল্লাহ আমাদের সকলকে তাঁর বিধান বুঝার এবং তা মেনে চলার তওফিক দান করুন । আমিন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন